বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী জাপানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করার লক্ষ্য নিয়ে চার দিনের সরকারি সফরে টোকিওর উদ্দেশে ঢাকা ছেড়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। রোববার (২৫ অক্টোবর) দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে বাংলাদেশ বিমানের একটি নিয়মিত ফ্লাইটে সফরসঙ্গীদের নিয়ে তিনি যাত্রা করেন। সোমবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তার জাপানের নারিতা বিমানবন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং জাপান বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা স্বাগত জানাবেন বলে জানা গেছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত এই সফর করবেন তারেক রহমান। সফর শেষে আগামী ২৯ অক্টোবর তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পাবে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, সফরের মাধ্যমে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও গভীর হবে এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে জাপানের অংশগ্রহণ বাড়বে।
গত ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠনের পর এটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চতুর্থ বিদেশ সফর। এর আগে ২২ থেকে ২৬ জুন তিনি মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। পরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে অংশ নিতে ২১ থেকে ২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে যান। এবার জাপান সফরে তার সঙ্গে রয়েছেন মন্ত্রিসভার সদস্য, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সফরসঙ্গী হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও রয়েছেন।
সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক ২৭ অক্টোবর
সফরের দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠক করবেন তারেক রহমান। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন তিনি। পরে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তার।
বৈঠকে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাংলাদেশে ব্যবসা ও উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ, জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন, জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এবং জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে।
সফরসূচিতে জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরামে বক্তব্য প্রদান এবং দেশটির ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের কর্মসূচিও রাখা হয়েছে। এসব বৈঠকের মাধ্যমে বাংলাদেশে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা এবং দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
জ্বালানি ও শিল্পকারখানা পরিদর্শন করবেন প্রধানমন্ত্রী
সরকারি বৈঠকের পাশাপাশি জাপানের শিল্প ও জ্বালানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও পরিদর্শন করবেন তারেক রহমান। প্রাথমিক সফরসূচি অনুযায়ী, তিনি চিবা অঞ্চলের এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়া শহরে গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার কারখানা পরিদর্শন করতে পারেন।
জ্বালানি অবকাঠামো পরিদর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে অভিজ্ঞতা বিনিময় ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার সুযোগ খতিয়ে দেখা হবে। অন্যদিকে, ইউনিক্লো ও টয়োটার মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে বাংলাদেশে শিল্পকারখানা স্থাপন, উৎপাদন কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সরকারের অগ্রাধিকারগুলোর মধ্যে রয়েছে জাপানি বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের শিল্প খাতে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা, দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য জাপানের শ্রমবাজারে সুযোগ সম্প্রসারণে সহযোগিতা বাড়ানো।
চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের প্রস্তুতি
সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সফরে দুই দেশের মধ্যে চারটির বেশি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তবে এসব চুক্তির চূড়ান্ত সংখ্যা ও বিষয়বস্তু আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া সাপেক্ষ।
সম্ভাব্য আলোচ্যসূচিতে রয়েছে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সহজীকরণ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং কৃষি ও মৎস্য খাতে যৌথ উদ্যোগ। পাশাপাশি কর্মসংস্থান, কারিগরি দক্ষতা উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ও পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়েও সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণের আলোচনা হতে পারে।
বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অর্থায়ন এবং ঋণের শর্ত পর্যালোচনার বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। এ ছাড়া রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিনিময়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদারের প্রত্যাশা
বাংলাদেশ ও জাপানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর থেকেই দেশটির উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে জাপান। বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, বিশেষ করে ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানি সহযোগিতা রয়েছে।
জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার মাধ্যমে বাংলাদেশে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। এসব প্রকল্প পরিবহন, যোগাযোগ, জ্বালানি ও নগর অবকাঠামোর উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক সাধারণ উন্নয়ন সহযোগিতার গণ্ডি পেরিয়ে কৌশলগত অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতেও দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ছে।
অন্যদিকে, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি বাজার ধরে রাখা, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় জাপানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর করা বাংলাদেশের জন্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে ঘোষিত উদ্যোগগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে আলোচনার ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন এবং জাপানি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেওয়ার ওপর।

