ইরানে পারমাণবিক হামলার শঙ্কা, ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন নেতানিয়াহু: কার্লসন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

ইরানের একটি সন্দেহভাজন পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক টাকার কার্লসন। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই দেশটিতে পারমাণবিক হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন দাবি করেছেন তিনি। এ জন্য ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কার্লসন। তবে ইরানে হামলার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি ওয়াশিংটন।

- Advertisement -

সোমবার (২ নভেম্বর) তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় সময় রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন টাকার কার্লসন। তাঁর দাবি, ইরানের মধ্যাঞ্চলে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন নামে পরিচিত একটি পাহাড়ি স্থাপনা যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সন্দেহ, সেখানে পুনরায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের কার্যক্রম শুরু করেছে তেহরান। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে এখনো নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

কার্লসনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই স্থাপনার ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গগুলো প্রায় ৩০০ ফুট পুরু গ্রানাইট পাথরের নিচে অবস্থিত। ফলে প্রচলিত সামরিক অস্ত্র দিয়ে সেখানে কার্যকর হামলা চালানো কঠিন। এ পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনায় আসতে পারে বলে দাবি করেছেন তিনি।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রতিদিন ফোন করে ট্রাম্পকে এ ধরনের হামলার বিষয়ে চাপ দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কার্লসন। অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ইরানে সামরিক অভিযান চালানোর বিষয়ে নেতানিয়াহু নিয়মিত মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।

কার্লসনের মতে, ইরানে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর পেছনে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। তাঁর দাবি, ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে এবং ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ট্রাম্পের সহযোগিতা প্রয়োজন নেতানিয়াহুর। অন্যথায় রাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়তে পারেন তিনি।

এ ছাড়া ইরানে নতুন করে অভিযান শুরুর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ ও সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে দাবি করেছেন কার্লসন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফও নেতানিয়াহুর অবস্থানের প্রতি সমর্থন দিচ্ছেন বলে অভিযোগ তাঁর।

ইরানে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন এই বিশ্লেষক। তাঁর দাবি, উপসাগরীয় দেশগুলোও নতুন সংঘাতের আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। এ পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহু গত ২৭ সেপ্টেম্বর গোপনে আবুধাবি সফর করে ইরানে হামলার বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আমিরাতের কর্মকর্তারা এতে সম্মতি দেননি বলে দাবি করেছেন তিনি।

চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন কার্লসন। তাঁর ভাষ্য, দীর্ঘ আট মাসের সংঘাতে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি ও সারবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শুধু অক্টোবর মাসেই হরমুজ প্রণালিতে বিশ্বের প্রায় ৮৫০টি তেলবাহী সুপারট্যাংকারের মধ্যে ১১টি গুরুতর ক্ষতির শিকার হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

পিকঅ্যাক্স মাউন্টেনে পারমাণবিক হামলা হলে এর ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন কার্লসন। তাঁর আশঙ্কা, বিস্ফোরণের ফলে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ১০ কোটি মানুষের পানির সরবরাহ হুমকির মুখে পড়তে পারে।

এ ধরনের হামলা বিশ্ব রাজনীতিতে বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে বলে মনে করেন তিনি। কার্লসনের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধেও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ঝুঁকি বাড়বে। একই সঙ্গে ভারত-পাকিস্তান এবং উত্তর কোরিয়া-দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে নতুন করে পারমাণবিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

নিজের পোস্টে কার্লসন আরও দাবি করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক নীতিতে নীরবে পরিবর্তন এনেছে। এর ফলে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের উপযোগী ছোট আকারের পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়েছে। আগামী ৭ নভেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে ট্রাম্প সিদ্ধান্ত নিতে পারেন বলেও দাবি তাঁর।

তবে কার্লসনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার পক্ষে। নতুন করে যুদ্ধ শুরু না করে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।

এদিকে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, গত শনিবার ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে উত্তেজনাপূর্ণ ফোনালাপ হয়েছে। ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করতে আগ্রহী নেতানিয়াহু। তবে ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যেতে চান।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংবেদনশীল সামরিক পরিকল্পনা নিয়ে প্রশাসন মন্তব্য করবে না। তবে ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে ট্রাম্প সব ধরনের বিকল্প বিবেচনায় রেখেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। অন্যদিকে পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন কমপ্লেক্সে পারমাণবিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা ওয়াশিংটন ও তেল আবিবকে নতুন করে সামরিক আগ্রাসন চালানোর বিষয়ে সতর্ক করেছেন।

সর্বশেষ