যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির বিরুদ্ধে জনঅসন্তোষের মধ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবারের নির্বাচন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে মরিয়া রিপাবলিকানরা। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা। এমন রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই ভোটগ্রহণের দিন ইসরায়েলকে দেওয়া ১০ বছর মেয়াদি নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন ট্রাম্প।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ভোটগ্রহণ শুরু হয়। নির্বাচনের ফলাফল আজ রাতের মধ্যেই জানা যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এবারের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী না হলেও তাঁর শাসনামলের কর্মকাণ্ড, অর্থনৈতিক নীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকা ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে।
কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করতে পারবে ডেমোক্র্যাটরা। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত শুরুর সুযোগও পাবে বিরোধী দল। অন্যদিকে সিনেটে নিয়ন্ত্রণ হারালে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়তে পারে।
এবার প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে নির্বাচন হচ্ছে। সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ভোট হচ্ছে ৩৫টিতে। দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদে মাত্র তিনটি আসন বাড়াতে হবে। সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন চারটি আসনের নিট বৃদ্ধি। এ ছাড়া ৩৬টি অঙ্গরাজ্যে গভর্নর নির্বাচন এবং বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় হাজার হাজার আসনেও ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
নির্বাচনের আগে প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার চিত্র উঠে এসেছে। দেশব্যাপী একটি জরিপে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মত দিয়েছেন ৪৬ শতাংশ ভোটার। বিপরীতে রিপাবলিকানদের সমর্থন জানিয়েছেন ৩৮ শতাংশ।
ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় ফিরলেও মূল্যস্ফীতি, শুল্কনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়েছে। এতে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেড়েছে।
সিএনএনের ‘পোল অব পোলস’ অনুযায়ী, ট্রাম্পের গড় জনসমর্থন নেমে এসেছে ৩৪ শতাংশে। অক্টোবরে প্রকাশিত সিএনএনের আরেক জরিপে তাঁর প্রতি সমর্থন ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ। একই জরিপে ৭৩ শতাংশ উত্তরদাতা অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।
তবে ভোটের দিনও নিজের প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ট্রাম্প। ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং শুল্কনীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন তিনি। তাঁর দাবি, দুই বছর আগের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অনেক শক্তিশালী এবং অন্যান্য দেশও এখন ওয়াশিংটনকে সম্মান করছে।
এদিকে নির্বাচনের দিন ইসরায়েলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সহায়তা চুক্তি বাতিলের ঘোষণা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে আলোচনা করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইসরায়েলেরও এই সহায়তা বন্ধে আপত্তি নেই বলে দাবি করেন তিনি।
২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত ১০ বছর মেয়াদি এই চুক্তি সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলে করা হয়েছিল। এর আওতায় ২০২৮ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলকে প্রতিবছর ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার কথা ছিল।
ট্রাম্পের ভাষ্য, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও দেশটির এখন আর আগের মতো আর্থিক ও সামরিক সহায়তার প্রয়োজন নেই। তবে ভবিষ্যতে ইসরায়েলের প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র আবারও সহযোগিতা করতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশটিকে অর্থনৈতিক ও সামরিক খাতে ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করেই এ হিসাব করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কংগ্রেসে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে, নাকি ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ওপর নতুন নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, এখন সেই দিকেই নজর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলের।

