হামলার ক্ষতি কাটিয়ে জ্বালানি খাত পুনর্গঠনে কঠিন পথে ইরান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো। তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটির উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে বড় ধরনের চাপ। এসব স্থাপনা মেরামত করে আবার উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হলেও আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া এবং আধুনিক জ্বালানি শিল্প গড়ে তোলা ইরানের জন্য সহজ হবে না।

- Advertisement -

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নিজস্ব প্রকৌশলীদের দক্ষতা এবং চীন ও রাশিয়ার সম্ভাব্য সহযোগিতায় ক্ষতিগ্রস্ত অনেক স্থাপনা সচল করা যেতে পারে। তবে দীর্ঘদিনের পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক সংকট, প্রযুক্তির ঘাটতি এবং নতুন করে সামরিক হামলার আশঙ্কা পুনর্গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্যাটেলাইট চিত্র ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ১৪ জুনের হামলায় তেহরানের শাহরান তেল ডিপোর চারটি সংরক্ষণ ট্যাংক ধ্বংস হয়। একই সময়ে দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ ঘনমিটার গ্যাস উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের মার্চে শাহরান, আকদাসিয়েহ ও কারাজের তেল সংরক্ষণাগারের পাশাপাশি তেহরান শোধনাগারেও হামলার ঘটনা ঘটে। আসালুয়েহ এলাকায় দক্ষিণ পার্সের গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্যে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পেও হামলার প্রভাব পড়েছে। ৪ এপ্রিল মাহশাহরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ও পরিষেবা সরবরাহকারী স্থাপনায় আঘাত লাগে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বান্দার ইমাম শিল্প কমপ্লেক্সও। এসব স্থাপনার ওপর নির্ভরশীল আশপাশের বহু কারখানা। ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র অচল হয়ে পড়লে একসঙ্গে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

ধীরে ধীরে ফিরছে উৎপাদন

যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি সামাল দিতে ইরান ইতোমধ্যে কিছু স্থাপনায় মেরামতকাজ শুরু করেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে উৎপাদনও আংশিকভাবে ফিরেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে দেওয়া এক ইরানি কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের ক্ষতিগ্রস্ত উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। যদিও এ দাবির স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ইরানের জ্বালানি খাতে স্থানীয় প্রকৌশলীদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটির প্রকৌশলীরা বিভিন্ন জ্বালানি প্রকল্প পরিচালনা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি তৈরির চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। দেশটির এমএপিএনএ প্রতিষ্ঠান উন্নত গ্যাস টারবাইন তৈরির পরীক্ষায় সাফল্যের কথাও জানিয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামত করা আর পুরো জ্বালানি খাতকে আধুনিক করা এক বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় ইরানের অনেক স্থাপনার যন্ত্রপাতি পুরোনো হয়ে গেছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহেও নিষেধাজ্ঞার কারণে জটিলতা রয়েছে।

দক্ষিণ পার্স নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ইরানের জ্বালানি খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্র। এখান থেকে উৎপাদিত গ্যাস দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা ও গৃহস্থালি ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু গ্যাসক্ষেত্রটির বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন ধরে রাখার চ্যালেঞ্জও বাড়ছে।

গ্যাসের চাপ বজায় রাখতে এবং উৎপাদন অব্যাহত রাখতে বিশেষ কম্প্রেসরসহ আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজন। এ ধরনের যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে বিপুল বিনিয়োগ দরকার। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতা না থাকায় ইরানের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ফলে হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামতের পাশাপাশি পুরোনো অবকাঠামোর আধুনিকায়নও দেশটির জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে।

এলএনজি বাজারে প্রবেশের স্বপ্ন অনিশ্চিত

বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানির পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের ইরানের। বিপুল গ্যাসসম্পদ থাকা সত্ত্বেও দেশটি এখনো বড় পরিসরে এলএনজি রপ্তানির সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারেনি।

এলএনজি উৎপাদনের জন্য বিশেষায়িত প্রযুক্তি, উন্নত প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, বিপুল অর্থায়ন এবং গ্যাস পরিবহনের উপযোগী জাহাজ প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ক্রেতাও নিশ্চিত করতে হয়। নিষেধাজ্ঞার কারণে এসব সুযোগ ও প্রযুক্তি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত করে অভ্যন্তরীণ গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলেও এলএনজি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হতে ইরানকে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।

চীন-রাশিয়ার সহযোগিতা কতটা কার্যকর হবে

পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের জ্বালানি খাতের পুনর্গঠনে চীন ও রাশিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। চীন ইরানের তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হওয়ায় দেশটি প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা ও অর্থায়নের ক্ষেত্রে সহায়তা দিতে পারে।

তবে তেল কেনা এবং কোনো দেশের জ্বালানি অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এর আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পর চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সিএনপিসি দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রের একটি প্রকল্প থেকে সরে গিয়েছিল। ফলে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোও ঝুঁকি ও মুনাফার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে।

অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গেও ইরানের জ্বালানি সহযোগিতার পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়ার গ্যাজপ্রম ও ইরানের জাতীয় তেল কোম্পানির মধ্যে ৪০ বিলিয়ন ডলারের একটি সমঝোতা হয়েছিল। তবে সেই চুক্তির আওতায় বাস্তবে কতটা অগ্রগতি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। নিজের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে রাশিয়া ইরানের পুনর্গঠনে কতটা বড় বিনিয়োগ করতে পারবে, সেটিও অনিশ্চিত।

নতুন হামলার ঝুঁকিতে বিদেশি বিনিয়োগ

ইরানের জ্বালানি খাত পুনর্গঠনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তাগুলোর একটি হলো নিরাপত্তা পরিস্থিতি। মেরামতের পর আবারও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের হামলা হলে নতুন করে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো। এতে বিনিয়োগের অর্থ হারানোর আশঙ্কা তৈরি হবে।

এ কারণে বিদেশি কোম্পানিগুলো ইরানে বড় প্রকল্পে অর্থায়ন কিংবা আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিতে পারে। রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও কঠিন হবে।

সব মিলিয়ে ইরানের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামত করে জ্বালানি উৎপাদন ও সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে হবে।

কিছু স্থাপনা কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যে সচল করা সম্ভব হলেও বড় ধরনের যন্ত্রপাতি প্রতিস্থাপন এবং আধুনিক প্রযুক্তি সংযোজনে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই শুধু মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হবে ইরানের জ্বালানি খাত পুনর্গঠনের মূল পরীক্ষা।

সূত্র: ইরান ইন্টারন্যাশনাল

সর্বশেষ