দুর্নীতি ও সরকারি অর্থের অপচয়ে জড়িতদের ছাড় নয়: সংসদীয় কমিটি

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

সরকারি অর্থের অপচয়, দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কোনোভাবেই দায়মুক্তি দেওয়া হবে না বলে কঠোর অবস্থান জানিয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত কমিটি। অতীতের অনিয়মের পাশাপাশি বর্তমান সরকারের সময়েও দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

- Advertisement -

রোববার (৮ নভেম্বর) জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির অষ্টম বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি।

বৈঠকে কমিটির সদস্য ও হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ অপু, হুইপ মো. আখতারুজ্জামান মিয়া, মোছা. তাহসিনা রুশদীর, খোন্দকার আবু আশফাক এবং মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া অংশ নেন।

বৈঠকে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন আর্থিক হিসাব এবং কমপ্লায়েন্স অডিট প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়। বিশেষ করে ২০২০-২১ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরের হিসাবসংক্রান্ত অডিট রিপোর্ট এবং মোংলা বন্দরের অডিট আপত্তি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

এ ছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন দুই বন্দরের দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হয়। এসব আপত্তির বিপরীতে অর্থ আদায়, সমন্বয়, নিয়মিতকরণ, অবলোপন ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।

কমিটি বিগত সরকারের সময়ে সংঘটিত আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেয়। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। সরকারি অর্থের অপব্যবহারের ঘটনায় কাউকে ছাড় না দেওয়ার পাশাপাশি বর্তমান সরকারের আমলেও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি বজায় রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বন্দর ব্যবস্থাপনায় এআই ব্যবহারের সুপারিশ

আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে ওভার-ইনভয়েসিং ও আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মতো অনিয়ম বন্ধ করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে কমিটি। এ জন্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মের পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সুপারিশ করা হয়।

একই সঙ্গে ই-বিলিং ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে শুল্ক পরিশোধ প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয় করা এবং দ্রুত পণ্য খালাসের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। এতে বন্দরের সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে মনে করছে কমিটি।

ব্যাংকে এফডিআর বিনিয়োগ নিয়ে অসন্তোষ

বন্দর কর্তৃপক্ষের অর্থ বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকে, বিশেষ করে আর্থিক সংকটে থাকা বেসরকারি ব্যাংকে এফডিআর হিসেবে জমা রাখার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অর্থ উত্তোলন না করা এবং নীতিমালা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগের ঘটনায় অসন্তোষ জানায় কমিটি।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে অর্থ উদ্ধারের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়। ভবিষ্যতে বন্দর কর্তৃপক্ষের সব অর্থ সরকারি ব্যাংকে জমা রাখার বিষয়েও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

ডিসেম্বরের মধ্যে নিলামযোগ্য কনটেইনার নিষ্পত্তির তাগিদ

চট্টগ্রাম বন্দরে দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকা নিলামযোগ্য কনটেইনার ও যানবাহনের জট নিরসনে সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার সুপারিশ করেছে কমিটি। আগামী ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে এসব কনটেইনার ও যানবাহনসংক্রান্ত সমস্যা নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।

এ ছাড়া খালি কনটেইনারের আড়ালে পণ্যভর্তি কনটেইনার বের করে নেওয়া এবং বন্দর থেকে কনটেইনার চুরির ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি পরবর্তী বৈঠকে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় খতিয়ে দেখার নির্দেশ

চট্টগ্রাম, মোংলা ও পায়রা বন্দরের ড্রেজিং কার্যক্রম, নাব্যতা বৃদ্ধি, নির্ধারিত ড্রাফট অর্জন এবং কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়।

এসব প্রকল্পে বরাদ্দ ও ব্যয় করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সম্ভাব্য অনিয়ম চিহ্নিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট অডিট আপত্তিগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

অন্যদিকে বন্দর কর্তৃপক্ষের তহবিল থেকে মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মবহির্ভূতভাবে বিশেষ উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ ধরনের আর্থিক অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বৈঠকে হিসাব মহানিয়ন্ত্রক (সিজিএ), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিব, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান ও কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

সর্বশেষ