মৌসুমী হত্যার নেপথ্যে কে? সিসিটিভির সূত্রে ‘কথিত স্বামী’ আটক

মো.মোক্তার হোসেন বাবু:
spot_img

মো.মোক্তার হোসেন বাবু: রাত তখন ১টা ১৪ মিনিট। চারপাশ যখন প্রায় নিস্তব্ধ, তখন সাদা টি-শার্ট পরা এক যুবক প্রবেশ করেন চট্টগ্রামের খুলশীর আমবাগান রেলওয়ে কলোনির একটি ঘরে। প্রায় ২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিট পর, রাত ৩টা ৫২ মিনিটে তাকে আবার বের হতে দেখা যায়। এরপরই নিস্তব্ধ হয়ে যায় ওই ঘর। পরদিন সকালে সেখান থেকেই উদ্ধার হয় হিজড়া সম্প্রদায়ের ‘গুরুমা’ হিসেবে পরিচিত মৌসুমী হিজড়ার (৫২) মরদেহ।

- Advertisement -

সিসিটিভির এই কয়েক ঘণ্টার ফুটেজই এখন মৌসুমী হত্যা মামলার তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। ফুটেজ বিশ্লেষণ করে ওই যুবককে মো. মোমিন ওরফে শেখ রনি (৩৪) হিসেবে শনাক্ত করেছে পুলিশ। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, মৌসুমীকে মারধরের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে হত্যার প্রকৃত কারণ কী এবং এর পেছনে আর কেউ জড়িত কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

মোমিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থানার সব্দলপুর গ্রামের বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার পাঠানপাড়ায় ফাল্গুনী হিজড়া নামে এক নেত্রীর বাসায় থাকতেন। সেখানে তিনি তার ‘কথিত স্বামী’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

টাকা ও দুই মোবাইল ফোন নিখোঁজ

তদন্তে সিসিটিভির পাশাপাশি আরেকটি বিষয় পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে মৌসুমীর ঘর থেকে নগদ টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন উধাও হয়ে যাওয়া।

মৌসুমীর বাসার পেছনে একটি গরুর খামার ছিল। ঘটনার আগের দিন একটি গরু বিক্রি করে পাওয়া উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টাকা তিনি ঘরে রেখেছিলেন বলে জানা গেছে। পরদিন আরও গরু কেনার পরিকল্পনাও ছিল তার। কিন্তু সকালে ঘরে তার মরদেহ পাওয়ার পর সেই টাকা ও ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোন আর পাওয়া যায়নি।

ফলে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে টাকা ও মোবাইল ফোন নিখোঁজ হওয়ার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

ভোররাতে শোনা গিয়েছিল বাকবিতণ্ডা

গত ৪ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতের ওই ঘটনার আগে-পরে আশপাশের বাসিন্দাদের বক্তব্যও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। প্রতিবেশীদের কয়েকজন জানিয়েছেন, ভোররাতের দিকে মৌসুমীর ঘর থেকে বাকবিতণ্ডার শব্দ শোনা গিয়েছিল। তবে পরিচিত কেউ এসেছেন মনে করে তারা বিষয়টি নিয়ে তখন কোনো সন্দেহ করেননি।

পরদিন সকালে দীর্ঘ সময় ঘর থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে হিজড়া সম্প্রদায়ের সদস্য পাখি রহমান সেখানে যান। ঘরে ঢুকে তিনি মৌসুমীকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তার মুখ দিয়ে রক্ত পড়ছিল, চোখ ছিল ফোলা এবং জিহ্বা বাইরে বেরিয়ে ছিল। পরে খবর দেওয়া হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে।

২ ঘণ্টা ৩৮ মিনিটই এখন তদন্তের কেন্দ্রে

তদন্তকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রাত ১টা ১৪ মিনিট থেকে ৩টা ৫২ মিনিট পর্যন্ত সময়টি। এই সময়ের মধ্যেই মোমিন মৌসুমীর ঘরে ছিলেন বলে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে।

ফুটেজে প্রবেশ ও বের হওয়ার দৃশ্য পাওয়ার পর পুলিশ তার পরিচয় শনাক্ত করে। এরপর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এখন পুলিশি জিজ্ঞাসাবাদে ওই সময়ের মধ্যে ঘরে কী ঘটেছিল, মোমিন কেন সেখানে গিয়েছিলেন এবং বের হওয়ার সময় তিনি সঙ্গে করে কিছু নিয়ে গিয়েছিলেন কি না এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

খুলশী থানার এসআই গোলাম মোহাম্মদ নাসিম জানান, সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে মোমিনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে পুলিশি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং খোয়া যাওয়া টাকা ও মোবাইল ফোন উদ্ধারে তদন্ত চলছে।

এদিকে মোমিনের গ্রেপ্তারের পর মৌসুমী হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটনের ক্ষেত্রে নতুন অগ্রগতি এসেছে বলে মনে করছে পুলিশ। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধুই টাকা-পয়সার বিষয়, নাকি ব্যক্তিগত বিরোধ বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে তা নিশ্চিত হতে তদন্ত শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে হবে।

সর্বশেষ