বিশ্ববাজারে এলএনজির টান, শীতে বাড়তে পারে দাম

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

বিশ্বের জ্বালানি বাজারে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির সরবরাহ সংকট। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি কমে যাওয়ায় এরই মধ্যে এশিয়ার বাজারে জ্বালানিটির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সামনে শীত মৌসুম হওয়ায় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা।

- Advertisement -

ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার পাইপলাইন গ্যাসের বিকল্প হিসেবে ইউরোপ কাতারের এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ায়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে সেই নির্ভরতার ঝুঁকি এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গত মার্চে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার প্রেক্ষাপটে কাতারের এলএনজি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়। এরপর চুক্তিবদ্ধ ক্রেতাদের সব এলএনজি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানায় দোহা।

এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক সরবরাহে। সাম্প্রতিক সময়ে কাতার মাত্র ৯৮টি এলএনজি কার্গো পাঠিয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫৩৬টি কম। এর ফলে প্রায় ৩ কোটি ৯০ লাখ টন সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হয়েছে, যা গত বছরের বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৯ শতাংশের সমান।

সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে এশিয়ার বাজারেও। বর্তমানে এ অঞ্চলে প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিট (এমএমবিটিইউ) এলএনজির দাম প্রায় ২৫ ডলার। যুদ্ধ শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই দাম প্রায় ১৪০ শতাংশ বেশি।

শীত নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এলএনজি বাজারের বড় পরীক্ষা এখনো সামনে। সাধারণত গ্রীষ্মকালে ইউরোপ শীতের প্রস্তুতি হিসেবে গ্যাসের মজুত বাড়িয়ে নেয়। এবার এশিয়ার দেশগুলো আটলান্টিক অঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ এলএনজি কার্গো কিনে নেওয়ায় ইউরোপের মজুত প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম রয়েছে।

বর্তমানে ইউরোপের গ্যাস মজুতের মাত্রা প্রায় ৭২ শতাংশ। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের একই সময়ে গড় মজুত ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ। অর্থাৎ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় এবার ইউরোপের হাতে জ্বালানি মজুত অনেক কম।

জার্মানির পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশটির গ্যাস মজুত প্রায় ৫৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে নভেম্বর ও পরবর্তী সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি ঠান্ডা পড়লে ইউরোপকে দ্রুত আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি কিনতে হতে পারে।

এ অবস্থায় এলএনজির দাম প্রতি এমএমবিটিইউ ৩০ থেকে ৪০ ডলারে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। শীতের তীব্রতা বাড়লে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সীমিত সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতাও আরও বাড়তে পারে।

সিঙ্গাপুরের এক সাবেক জ্বালানি কর্মকর্তার মতে, পরিস্থিতি চরম পর্যায়ে পৌঁছালে এলএনজির দামের ওপর কার্যত কোনো নির্দিষ্ট সীমা নাও থাকতে পারে।

কাতারের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা

কাতারের এলএনজি সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কত সময় লাগবে, সেটিও এখন বড় প্রশ্ন। দেশটির প্রধান এলএনজি উৎপাদন ও তরলীকরণ অবকাঠামো এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারেনি। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

কাতারের সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী শীতের আগে ইউরোপকে অতিরিক্ত প্রায় ২ কোটি টন এলএনজি সংগ্রহ করতে হতে পারে। এর প্রভাব শুধু চলতি শীতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ২০২৭ সালজুড়েও বৈশ্বিক বাজারে এলএনজির দামের ওপর চাপ থাকতে পারে।

কয়েক বছর পর চিত্র হতে পারে উল্টো

তবে দীর্ঘমেয়াদে এলএনজি বাজারে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। আগামী কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নতুন এলএনজি প্রকল্প চালু হলে বিশ্ববাজারে সরবরাহ দ্রুত বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার পথে। পাশাপাশি কানাডা, আর্জেন্টিনা ও সেনেগালেও নতুন প্রকল্প এগিয়ে চলছে। ছোট ও মডুলার তরলীকরণ প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় নতুন নতুন দেশও এলএনজি রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন করছে।

পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে বছরে এলএনজি সরবরাহ প্রায় ৬৩ কোটি টনে পৌঁছাতে পারে। গত বছরের তুলনায় এটি প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, সরবরাহের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চাহিদা বাড়বে না বলে ধারণা করছে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। রিস্ট্যাড এনার্জির পূর্বাভাস অনুযায়ী, দশকের শেষ দিকে বৈশ্বিক এলএনজি চাহিদা সর্বোচ্চ ৫৭ কোটি ৪০ লাখ টন হতে পারে।

কাতারের সরবরাহ পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে এলে এবং পরিকল্পিত প্রকল্পগুলো চালু হলে বাজারে প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি থেকে সাড়ে সাত কোটি টন অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজির দাম কমে প্রতি এমএমবিটিইউ ৬ ডলারের নিচে নেমে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

অর্থাৎ, বর্তমানের সরবরাহ ঘাটতি কয়েক বছরের মধ্যে উল্টো অতিরিক্ত সরবরাহের সমস্যায় পরিণত হতে পারে। এই অনিশ্চয়তার কারণে বড় ক্রেতা ও বিক্রেতারা নিজেদের ঝুঁকি কমাতে গ্যাস মজুত, রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নিজস্ব ট্রেডিং কার্যক্রম সম্প্রসারণের মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এলএনজির বৈশ্বিক বাজারে আগামী কয়েক বছর সরবরাহ ও চাহিদার পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে দামে বড় ধরনের ওঠানামা অব্যাহত থাকতে পারে।

সর্বশেষ