ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ লক্ষ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বাড়ানো এবং দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির (পিটিএ) আলোচনা আবারও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আনিস মাত্তারের বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে তৈরি পোশাক, ওষুধ, ভ্যাকসিন ও কৃষিপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, জ্বালানি সহযোগিতা, হালাল সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং দুই দেশের মধ্যে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (সিইপিএ) নিয়েও আলোচনা করা হয়।
রপ্তানি বাড়িয়ে ঘাটতি কমানোর লক্ষ্য
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে বর্তমানে বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হচ্ছে। এর মধ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে বাংলাদেশ প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। বিপরীতে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র প্রায় ৫৬ মিলিয়ন ডলার।
এই বড় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বাংলাদেশ থেকে ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দুই দেশের বাজারে প্রবেশের বাধাগুলো দূর করা সম্ভব হলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি করা সম্ভব।
ইন্দোনেশিয়ায় বাড়াতে চায় ওষুধ রপ্তানি
বৈঠকে বাংলাদেশি ওষুধ ও ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্যের ইন্দোনেশিয়ার বাজারে প্রবেশের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক মানের ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে এবং বিশ্বের শতাধিক দেশে এসব পণ্য রপ্তানি করা হয়। ইন্দোনেশিয়ার বাজারে রপ্তানি বাড়াতে ওষুধ নিবন্ধনসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত জটিলতা কমাতে দেশটির সহযোগিতা প্রয়োজন।
এ সময় জাকার্তায় বাংলাদেশি ফার্মাসিউটিক্যালস পণ্য নিয়ে একটি একক প্রদর্শনী আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়া হলে তাতে সম্মতি জানান ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী। প্রদর্শনী আয়োজনে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন তিনি।
থমকে থাকা পিটিএ আলোচনায় গতি আনার চেষ্টা
বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার মধ্যে পিটিএ নিয়ে চার দফা আলোচনা হলেও তৈরি পোশাকের শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধা নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ২০২৩ সাল থেকে আলোচনা স্থবির রয়েছে।
বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের টেক্সটাইল ও পোশাক খাতে প্রতিযোগিতা থাকলেও বিদ্যমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বের করা প্রয়োজন।
আগামী ১৪ থেকে ১৮ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রদর্শনীর সময় দুই দেশের মন্ত্রী পর্যায়ে বৈঠকের প্রস্তাব দেন তিনি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রী ও একটি প্রতিনিধিদলকে ওই প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানান।
জ্বালানি ও কয়লা আমদানিতেও আগ্রহ
বৈঠকে ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস কোম্পানি পারতামিনাকে বাংলাদেশের সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) টার্মিনাল পরিচালনার প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
বাংলাদেশের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানি বাড়ানোর সম্ভাবনাও বৈঠকে উঠে আসে।
আলু রপ্তানির বাধা দূর করার প্রস্তাব
ইন্দোনেশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি আলু রপ্তানির ক্ষেত্রে পরীক্ষাগার ও নিবন্ধনসংক্রান্ত জটিলতা রয়েছে। এসব বাধা দূর করতে দুই দেশের পরীক্ষার ফলাফল পারস্পরিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ায় আলু রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
এ ছাড়া হালাল পণ্যের বাণিজ্য সম্প্রসারণে দুই দেশের হালাল সনদ ও মানের পারস্পরিক স্বীকৃতির বিষয়েও আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সরকার-টু-সরকার সহযোগিতা গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও মতবিনিময় করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।
বৈঠকে উভয় পক্ষ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ-ইন্দোনেশিয়ার অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার আগ্রহ প্রকাশ করে।
এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত লিস্টিওয়াতিসহ দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

