হরমুজে হামলা বাড়তেই ঊর্ধ্বমুখী তেলের বাজার, দাম ছাড়াল ১০২ ডলার

বাণিজ্য ডেস্ক
spot_img

মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং উপসাগরীয় অঞ্চল ও হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলা বাড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে আবারও অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। এক দিনের ব্যবধানে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০২ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

- Advertisement -

বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টার দিকে অয়েল প্রাইস ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ২ দশমিক ০৬ ডলার বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০২ দশমিক ৩০ ডলারে লেনদেন হয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআইয়ের দাম ১ দশমিক ৫১ ডলার বেড়ে ৮৯ দশমিক ৭৯ ডলারে পৌঁছায়।

এর আগে বুধবার আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) কৌশলগত মজুত থেকে দ্রুত তেল বাজারে ছাড়ার উদ্যোগের কথা জানালে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছিল। কিন্তু হরমুজ প্রণালি ও উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে জাহাজে হামলার ঘটনা সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।

হরমুজ ঘিরে বাড়ছে সরবরাহের ঝুঁকি

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় আইইএ কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার কার্যক্রম জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে ডিজেলের সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে মজুত থেকে তেল ছাড়ার ঘোষণায় বাজারে স্থায়ী স্বস্তি আসেনি। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে।

যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও জ্বালানি সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাত অষ্টম মাসে গড়ানোর পর অক্টোবর মাসে এই নৌপথে জাহাজে হামলার ঘটনা বেড়েছে।

রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী তেলবাহী জাহাজে হামলার সংখ্যা সংঘাত শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো তেল রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করলেও পরিবহন ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

তেলবাহী জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা

সর্বশেষ হামলার ঘটনায় কাতারের উত্তরে একটি তেলবাহী জাহাজে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সংস্থা বুধবার জানায়, ওই হামলায় কয়েকজন নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

এ ধরনের হামলা তেল পরিবহনের ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি জাহাজ ও নাবিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে কি না, তা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

এএনজেড ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ পণ্যবাজার কৌশলবিদ ড্যানিয়েল হাইনস বলেন, অতীতে এ ধরনের হামলার কারণে পারস্য উপসাগর থেকে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার নজির রয়েছে। তবে এবার তেল রপ্তানির বিকল্প পথ সীমিত হওয়ায় উৎপাদক দেশগুলো জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা সত্ত্বেও সরবরাহ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে।

আইইএর তেল ছাড়ার উদ্যোগে স্থায়ী স্বস্তি নেই

কৌশলগত মজুত থেকে তেল ছাড়ার আইইএর সিদ্ধান্তও বাজারের উদ্বেগ পুরোপুরি কাটাতে পারেনি। ড্যানিয়েল হাইনসের মতে, নতুন করে যে তেল বাজারে ছাড়ার কথা বলা হচ্ছে, সেটি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর সময় ঘোষিত ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার পরিকল্পনারই অংশ হতে পারে।

অর্থাৎ, এটি কৌশলগত মজুত থেকে অতিরিক্ত নতুন তেল বাজারে আনার সিদ্ধান্ত নাও হতে পারে। তাঁর মতে, মজুত থেকে তেল ছাড়ার ফলে সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হলেও এর মাধ্যমে নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি হয় না।

কমেছে যুক্তরাষ্ট্রের তেলের মজুত

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও ভোক্তা যুক্তরাষ্ট্রের মজুতের পরিসংখ্যানও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছে।

গত ২ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত ৩২ লাখ ব্যারেল কমে ৪২ কোটি ৪১ লাখ ব্যারেলে নেমেছে। অথচ রয়টার্সের জরিপে বিশ্লেষকেরা মজুত ১৭ লাখ ব্যারেল কমার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।

এদিকে, ডিজেল ও জেট ফুয়েলসহ ডিস্টিলেট জ্বালানির মজুতও কমেছে। এক সপ্তাহে এই মজুত ৪২ হাজার ব্যারেল কমে ১০ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।

বছরের এই সময়ের গত পাঁচ বছরের গড়ের তুলনায় ডিস্টিলেটের মজুত বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ঝুঁকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কমে যাওয়া মজুত—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ