প্রতি তিন সেকেন্ডে বাল্যবিয়ের শিকার এক কন্যাশিশু, অধিকার নিশ্চিতের আহ্বান

নিজস্ব প্রতিবেদক
spot_img

নিজস্ব ভবিষ্যৎ গড়ার আগেই বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে বিশ্বের লাখো কন্যাশিশু। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে অনেকেই। বাল্যবিয়ের এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির মধ্যেই আজ রোববার (১১ অক্টোবর) পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস। দিবসটি উপলক্ষে কন্যাশিশুর অধিকার রক্ষা, সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বাল্যবিয়ে বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

- Advertisement -

বিশ্বজুড়ে বাল্যবিয়ের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি তিন সেকেন্ডে একজন কন্যাশিশু বাল্যবিয়ের শিকার হচ্ছে। এর ফলে বছরে ১ কোটি ২০ লাখের বেশি মেয়ের বিয়ে হয়ে যায় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগেই। এতে তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী জীবন গড়ার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ে।

জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘বাল্যবিয়ে বন্ধ করি, কন্যাশিশুর অধিকারে বিনিয়োগ করি’। কন্যাশিশু, অধিকারকর্মী, সুশীল সমাজ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শের ভিত্তিতে এই প্রতিপাদ্য নির্বাচন করা হয়েছে।

জাতিসংঘ জানিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বাল্যবিয়ের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটছে। বিশেষ করে সাহারা মরুভূমির দক্ষিণাঞ্চলের আফ্রিকান দেশগুলোতে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ওই অঞ্চলে ৩১ শতাংশ কন্যাশিশুর বিয়ে হয় অপ্রাপ্ত বয়সে।

বাল্যবিয়েতে ঝুঁকিতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
অল্প বয়সে বিয়ের কারণে কন্যাশিশুদের শিক্ষাজীবন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। অনেক কিশোরী বিষণ্নতা, মানসিক অস্থিরতা ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার শিকার হয়। কিশোরীদের মধ্যে আত্মক্ষতিও গুরুতর উদ্বেগের বিষয়। বিশ্বজুড়ে ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ আত্মক্ষতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে বাল্যবিয়ে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করে জাতিসংঘ। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ বছরে শিক্ষা বিস্তার, আইন প্রণয়ন ও সামাজিক সুরক্ষামূলক পদক্ষেপের ফলে আনুমানিক ৬ কোটি ৮০ লাখ বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ করা গেছে।

বাল্যবিয়ে বন্ধে মেয়েদের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা অব্যাহত রাখার সুযোগ নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং ক্ষতিকর সামাজিক প্রথা ও কুসংস্কার দূর করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে জাতিসংঘ। একই সঙ্গে কন্যাশিশুদের নেতৃত্ব বিকাশ এবং নিজেদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে মতামত দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।

জলবায়ু সংকটেও বাড়ছে কন্যাশিশুর ঝুঁকি
আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ‘বিশ্বের কন্যাশিশুদের অবস্থা’ শীর্ষক গবেষণায় পাঁচ হাজার কিশোরী ও তরুণীর মতামত নেওয়া হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশগত পরিবর্তন ও জলবায়ুজনিত দুর্যোগ মেয়েদের শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেদনে জলবায়ু সংকটের সঙ্গে যৌন নিপীড়ন, বাল্যবিয়ে এবং অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছে। দুর্যোগের কারণে পরিবার ও সমাজের নিরাপত্তাব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে মেয়েদের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

যেভাবে শুরু আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস
কন্যাশিশুর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্তর্জাতিক উদ্যোগের পেছনে রয়েছে ১৯৯৫ সালের বেইজিং বিশ্ব নারী সম্মেলন। ওই সম্মেলনে গৃহীত বেইজিং ঘোষণা নারী ও মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পরে ২০১১ সালের ১৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতিবছর ১১ অক্টোবর আন্তর্জাতিক কন্যাশিশু দিবস পালনের স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

জাতিসংঘের মতে, কন্যাশিশুরা নিরাপদ পরিবেশ, মানসম্মত শিক্ষা ও সমান সুযোগ পেলে পরিবার ও সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তাদের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করা গেলে দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

সূত্র: প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল

সর্বশেষ