ঘুষ গ্রহণ, অর্থ আত্মসাৎ ও জাল নথি তৈরির অভিযোগে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পাওয়া ছাতক উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের সাবেক রেকর্ড কিপার নীল বরণ ত্রিপুরাকে খালাস দিয়েছেন হাইকোর্ট। অভিযোগের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষ সুনির্দিষ্ট তথ্য ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারায় নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বাতিল করেছেন উচ্চ আদালত।
হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. বশীর উল্লাহর একক বেঞ্চ গত ১৪ সেপ্টেম্বর এ রায় দেন। সম্প্রতি প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, দাপ্তরিক কাজে অনিয়ম কিংবা জাল নোটিশ ইস্যুর মতো ঘটনা সন্দেহের সৃষ্টি করতে পারে। তবে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যায় না; অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে হয়।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, নীল বরণ ত্রিপুরা ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসে রেকর্ড কিপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পরে তাঁকে বগুড়া জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসে বদলি করা হয়।
ছাতকে দায়িত্ব পালনের সময় কর্মকর্তা ও সহকারী সেটেলমেন্ট অফিসারের স্বাক্ষর জাল করে ভুয়া আপিল নম্বর, নোটিশ ও রসিদ ইস্যু করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও আনা হয়।
এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালের ১৪ এপ্রিল ছাতক থানায় মামলা করা হয়। পরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত শেষে নীল বরণ ত্রিপুরার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
মামলার বিচার শেষে ২০২২ সালের ৩০ মার্চ সিলেটের বিশেষ জজ আদালত তাঁকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে তাঁকে ৬৯ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেন তিনি।
আপিলের শুনানিতে অভিযোগের পক্ষে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা করে উচ্চ আদালত দেখতে পান, রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীরা ঘুষ লেনদেনের কথা বললেও ঠিক কবে, কোথায়, কীভাবে এবং কত টাকা দেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। ফলে অভিযোগ প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘাটতি থেকে যায়।
পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত আরও উল্লেখ করেন, এজাহারে বর্ণিত অভিযোগের সঙ্গে সাক্ষীদের আদালতে দেওয়া মৌখিক বক্তব্যের অসংগতি রয়েছে। এ ছাড়া মামলার মূল সাক্ষীকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি। তাঁর পরিবর্তে তদন্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে শোনা কথাকে সাক্ষ্য হিসেবে উপস্থাপন করে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করা সম্ভব নয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, কোনো ঘটনার বিষয়ে সন্দেহ তৈরি হওয়া এবং অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগের গুরুত্ব যতই হোক, আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের জন্য গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রয়োজন।
এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে হাইকোর্ট মনে করেন, নীল বরণ ত্রিপুরার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে রাষ্ট্রপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে সিলেটের বিশেষ জজ আদালতের দেওয়া দণ্ডাদেশ বাতিল করে তাঁকে খালাস দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন উচ্চ আদালত।

