প্রবাসী বাংলাদেশিদের দেশে থাকা অর্থ-সম্পদ সুরক্ষা, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ এবং নানা ধরনের আইনি জটিলতা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের বিভাগীয় সদর দপ্তরগুলোতে এসব আদালত প্রতিষ্ঠা করা হতে পারে। এ লক্ষ্যে প্রস্তাবের খসড়া তৈরির কাজ চলছে। জনপরামর্শের প্রক্রিয়া শেষে সংসদের আগামী কোনো অধিবেশনে প্রস্তাবটি উত্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আয়োজিত ‘সোনার মানুষ সম্মিলন-২০২৬’ অনুষ্ঠানে এ পরিকল্পনার কথা জানান আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। অনুষ্ঠানে প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার রক্ষার বিষয়েও গুরুত্ব দেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে কঠোর পরিশ্রম করে তারা দেশে অর্থ পাঠাচ্ছেন। কিন্তু দেশে থাকা সম্পদ, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন কিংবা জমিজমা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে অনেককে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। বিদেশে অবস্থান করেও বছরের পর বছর মামলা পরিচালনা করতে হয় তাদের। অনেক ক্ষেত্রে মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি দেখে যাওয়ার সুযোগও হয় না; পরে উত্তরাধিকারীদের সেই মামলা চালিয়ে নিতে হয়।
প্রবাসীদের এ ধরনের দুর্ভোগ কমাতেই পৃথক বিশেষায়িত আদালত গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। তার মতে, প্রবাসীদের অর্থ-সম্পদ ও অন্যান্য আইনি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট এখতিয়ারসম্পন্ন আদালত থাকলে মামলা পরিচালনা সহজ হবে এবং দীর্ঘসূত্রতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
আইনমন্ত্রী জানান, বিশেষ আদালত গঠনের প্রস্তাবটি বর্তমানে খসড়া তৈরির পর্যায়ে রয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত নেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। জনপরামর্শের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে প্রস্তাবটি সংসদে উত্থাপনের বিষয়ে সরকার চিন্তাভাবনা করছে। চলতি অধিবেশনে তা সম্ভব না হলে পরবর্তী অধিবেশনে উপস্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন রামরুর সহযোগিতাও চান তিনি।
প্রবাসীদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকারের বিদ্যমান উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশি নারী-পুরুষ এবং তাদের সন্তানরা দেশে আইনি সমস্যায় পড়লে জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এর আওতায় প্রাথমিক আইনি পরামর্শের পাশাপাশি মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রবাসীদের আইনি জটিলতা ও হয়রানি কমবে বলে আশা করছে সরকার।
অনুষ্ঠানে বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের মজুরি বৈষম্য নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, শ্রম রপ্তানি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলেও অনেক বাংলাদেশি শ্রমিক অন্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পাচ্ছেন। এর পেছনে অসাধু ব্যবসায়ীদের কর্মকাণ্ড ও নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়ম অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে। এ পরিস্থিতি পরিবর্তনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিদেশে বাংলাদেশি শ্রমিকদের কঠিন কর্মপরিবেশের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, অনেক শ্রমিককে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় কাজ করতে হয়। কাজ শুরুর আগেই যাত্রার প্রস্তুতি নিতে হয়, আর দিন শেষে বাসায় ফিরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, রান্নাসহ প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করতে হয়। এত পরিশ্রমের পরও ন্যায্য মজুরি না পাওয়া তাদের জন্য বাড়তি দুর্ভোগ তৈরি করছে। শ্রমিকদের প্রাপ্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করতে এ বৈষম্য কমানোর ওপর জোর দেন তিনি।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশি কর্মীদের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতার বিষয়টিও তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি জানান, সেখানে অনেক প্রবাসীর ভিসা বাতিল হয়েছে এবং অনেকের ভিসা নবায়নের প্রক্রিয়া চলছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এরই মধ্যে পাঁচ হাজার ভিসা বাতিল হয়েছে। কিছু নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের জমা দেওয়া কাগজপত্রে অসংগতি এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের সনদ ব্যবহারের ঘটনাও সামনে এসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে নথির সত্যতা যাচাই করে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এসব কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও কল্যাণে রামরুর দীর্ঘদিনের ভূমিকার প্রশংসা করেন আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, গত তিন দশক ধরে সংগঠনটি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছে। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগঠনটির কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, আগামী প্রজন্মের হাত ধরে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় গত ৩০ বছরের অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হোক। এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যাশাও জানান তিনি, যেখানে দেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যেতে বাধ্য হতে হবে না; বরং দেশে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ তৈরি হবে এবং একসময় বাংলাদেশও অন্য দেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে।
সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রবাসীদের দেশে থাকা সম্পদ ও অধিকারসংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বিশেষায়িত আদালতের এখতিয়ার, কার্যক্রম ও প্রতিষ্ঠার সময়সীমা চূড়ান্ত হবে প্রস্তাবের খসড়া, জনপরামর্শ এবং পরবর্তী আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর।

