মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম: ফ্যাসিস্ট আমলে দেশের চামড়াশিল্পের অধঃপতন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ। তিনি বলেছেন, সরকার দেশের চামড়াশিল্পকে আবারও জাগিয়ে তুলতে চায়। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বিসিক নেতৃত্ব দিচ্ছে। একই সঙ্গে ওষুধশিল্পের উন্নয়ন ও সমস্যা সমাধানেও কাজ করছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সকালে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বিসিক আয়োজিত জব অ্যান্ড ক্যারিয়ার ফেয়ারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বিসিক চেয়ারম্যান বলেন, চামড়াশিল্পের সমস্যা সমাধানে অনেক সময় নষ্ট হয়েছে। এখন আর সময় নষ্ট করতে চান না তাঁরা। দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে শিল্পের বিকাশ, উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ একসময় কৃষিনির্ভর দেশ ছিল। ঘরে ঘরে কুটিরশিল্পের প্রচলন ছিল। ১৯৫৭ সালে ইপসিক প্রতিষ্ঠিত হয়, যা স্বাধীনতার পর বিসিকে রূপ নেয়। বর্তমানে সারা দেশে বিসিকের ৮৪টি শিল্পনগরী রয়েছে। এসব শিল্পনগরীতে উদ্যোক্তাদের কারখানা স্থাপনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির পাশাপাশি নারী ও পুরুষ উদ্যোক্তাদের ঋণ সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে।
বিসিক চেয়ারম্যান জানান, নারী উদ্যোক্তাদের ৫ শতাংশ এবং পুরুষ উদ্যোক্তাদের ৬ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া হচ্ছে। উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে ক্রেতাদের সংযোগ তৈরি করতে প্রতি মাসে মেলার আয়োজন করা হচ্ছে। আগামী ডিসেম্বরেও বড় পরিসরে মেলা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশীয় কাঁচামাল ও দক্ষতায় গুরুত্ব
শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে বেনজীর আহমেদ বলেন, আগে বাংলাদেশে সস্তা শ্রম ও গ্যাসের সুবিধা ছিল। এখন গ্যাসের প্রাপ্যতা কমেছে। এ পরিস্থিতিতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে দেশীয় কাঁচামালের ব্যবহার বাড়াতে হবে এবং শ্রমিকদের দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
তিনি বলেন, বিসিক দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিচ্ছে। ঢাকার চামড়া, প্লাস্টিক ও মুদ্রণশিল্পের কারখানাগুলো বিসিকের শিল্প পার্কে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পরিকল্পিত শিল্পায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি নগরীর পরিবেশ ও বসবাসের উপযোগিতা উন্নত করা সম্ভব।
চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতাদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির উদ্দেশ্যে জব ফেয়ারের আয়োজন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে কতটা মূল্য সংযোজন করা যাচ্ছে, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। সৃজনশীল অর্থনীতি ও উদ্যোক্তাভিত্তিক কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে।
আগ্রাবাদের যানজট ও দখল নিয়ে ক্ষোভ
অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন আগ্রাবাদের যানজট, ফুটপাত দখল ও নগর ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, বেকারত্ব দূর করতে বিসিকের এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের যে লক্ষ্য ঘোষণা করেছেন, তা বাস্তবায়নেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করছে।
চট্টগ্রাম নগরের পরিস্থিতি তুলে ধরে বেলায়েত হোসেন বলেন, আগের সরকারের আমলে একটি নান্দনিক শহরকে জলাবদ্ধতার শহরে পরিণত করা হয়েছে। আগ্রাবাদে ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কের অংশও হকারদের দখলে চলে গেছে। সড়কের দুই পাশে গাড়ি রাখায় যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। যানজটের কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের চলাচলও কঠিন হয়ে পড়ছে। এ পরিস্থিতিতে কিছু ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগ্রাবাদ থেকে সরে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, নগরীর অনিয়ম দূর করে পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। এ কাজে সমালোচনার আশঙ্কা না করে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে। চট্টগ্রামকে আরও বাসযোগ্য ও যানজটমুক্ত করতে পরিকল্পিত শিল্পনগরী গড়ে তুলে বিভিন্ন কারখানা স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
জব ফেয়ারে তাৎক্ষণিক নিয়োগপত্র
বিসিকের এ জব অ্যান্ড ক্যারিয়ার ফেয়ারে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। চাকরিপ্রার্থীদের অনেকে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেন। কয়েকজন তরুণকে তাৎক্ষণিক নিয়োগপত্রও দেওয়া হয়। আয়োজকদের মতে, এ ধরনের আয়োজন চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগদাতাদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে এবং চাকরির বাজারে প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পর্কে ধারণা দেয়।
দি চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞতা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ একসঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। বিসিকের প্রশিক্ষণ ও মেলা কার্যক্রমে চিটাগং চেম্বারকে যুক্ত রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশে বেকার মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ সমস্যা সমাধানে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে নতুন উদ্যোগ নিতে হবে। দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
বিসিক পরিচালক (প্রশাসন) মুহম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, দেশের শিল্পায়নে বিসিক দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। নতুন উদ্যোক্তা তৈরি ও শিল্পের বিকাশে সংস্থাটির কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
চট্টগ্রাম উইম্যান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি লুৎমিলা ফরিদ বলেন, জব ফেয়ারের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীরা নিয়োগদাতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন। পাশাপাশি চাকরির জন্য কী ধরনের দক্ষতা প্রয়োজন, সে সম্পর্কেও জানতে পারছেন। এ আয়োজন থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও মতামত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে বিনিময় করা গেলে পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করা এবং দক্ষতার ঘাটতি কমানো সম্ভব হবে। তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিসিক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক পরিচালক খালেদ মাহমুদ। তিনি বলেন, বিসিকের মূল কাজ উদ্যোক্তা সৃষ্টি করা। এ মেলায় অংশ নেওয়া উদ্যোক্তাদের সাফল্য দেখে তরুণেরা চাকরির পাশাপাশি নিজের উদ্যোগ গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা পাবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিসিকের উপমহাব্যবস্থাপক এসএম আলকাদেরী।

