চার দামস্তর, অথচ ১২ দামে বিক্রি হচ্ছে ৫৩ ব্র্যান্ডের সিগারেট

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

সরকার নির্ধারিত চারটি মূল্যস্তর থাকলেও দেশের বাজারে ১২টি পৃথক দামে বিক্রি হচ্ছে ৫৩টি সিগারেটের ব্র্যান্ড। এর মধ্যে শুধু নিম্নস্তরেই রয়েছে আট ধরনের দাম। ফলে দাম বাড়লেও ভোক্তারা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কমদামি ব্র্যান্ড বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে সিগারেটের দাম ও কর বাড়িয়ে তামাকের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ প্রত্যাশিত ফল দিচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

- Advertisement -

বেসরকারি গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) পরিচালিত এক জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গত মাসে দেশের আটটি বিভাগীয় শহরের ৮০ জন খুচরা বিক্রেতার ওপর এ জরিপ চালানো হয়।

জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নিম্নস্তরের সবচেয়ে দামি সিগারেটের মূল্য ৯০ টাকা, যা মধ্যমস্তরের নির্ধারিত ৯২ টাকার দামের কাছাকাছি। ফলে মূল্যস্তরগুলোর মধ্যে দামের ব্যবধান কম থাকায় ভোক্তাদের এক ব্র্যান্ড থেকে অন্য ব্র্যান্ডে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নস্তরের মধ্যেই একাধিক দামের সিগারেট থাকায় কম খরচে ধূমপান চালিয়ে যাওয়ার বিকল্প পাওয়া যাচ্ছে।

তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর দীর্ঘদিনের দাবি, সিগারেটের মূল্যস্তর পর্যায়ক্রমে চারটি থেকে কমিয়ে একটিতে নিয়ে আসা হোক। তাদের মতে, একক মূল্যস্তর চালু করা হলে দাম ও কর বাড়ানোর প্রভাব আরও কার্যকর হতে পারে। এতে তরুণ ও নিম্ন আয়ের ভোক্তাদের ধূমপান শুরু করা কিংবা ধূমপান অব্যাহত রাখার প্রবণতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

‘তদূর্ধ্ব’ শব্দেই তৈরি হচ্ছে একাধিক দামের সুযোগ

জরিপের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সরকার নির্ধারিত প্রতিটি মূল্যস্তরের সঙ্গে ‘তদূর্ধ্ব’ শব্দটি যুক্ত থাকায় সিগারেট কোম্পানিগুলো একই স্তরের মধ্যে বিভিন্ন দামে পণ্য বাজারজাত করার সুযোগ পাচ্ছে।

উদাহরণ হিসেবে, নিম্নস্তরের ক্ষেত্রে ৬৫ টাকা ও তদূর্ধ্ব এবং মধ্যমস্তরের ক্ষেত্রে ৯২ টাকা ও তদূর্ধ্ব মূল্য উল্লেখ রয়েছে। এর ফলে নিম্নস্তরের সিগারেট ৬৫ টাকা থেকে শুরু করে ৯১ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামে বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে। একইভাবে উচ্চতর মূল্যস্তরগুলোতেও একাধিক দামের ব্র্যান্ড রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

প্রজ্ঞার জরিপে বলা হয়েছে, এ ধরনের মূল্যকাঠামোর কারণে চারটি স্তর নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে বাজারে দামের বৈচিত্র্য অনেক বেশি। ভোক্তারা বেশি দামের ব্র্যান্ড ছেড়ে তুলনামূলক কমদামি ব্র্যান্ডে চলে যেতে পারায় কর ও মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে সিগারেটের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

একক মূল্যস্তরের পক্ষে তামাকবিরোধীরা

তামাক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বৈশ্বিক বিভিন্ন গবেষণার আলোকে একক মূল্যস্তর চালুর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তামাকবিরোধীরা। তাঁদের মতে, সব সিগারেটের জন্য একটি কার্যকর একক মূল্য নির্ধারণ করা গেলে কোম্পানিগুলোর বিভিন্ন দামের ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ভোক্তাদের ধরে রাখার সুযোগ সীমিত হবে।

তাঁদের যুক্তি, সিগারেটের দাম ও কর বৃদ্ধি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ধূমপানের ব্যয় বাড়বে। এতে বিশেষ করে তরুণ ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ধূমপান শুরু করার আগ্রহ কমতে পারে এবং বর্তমান ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়ার প্রণোদনা বাড়তে পারে।

মূল্যকাঠামো সংস্কারের সুপারিশ

জরিপে সিগারেটের মূল্যস্তরগুলোর সঙ্গে ‘তদূর্ধ্ব’ শব্দটি বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর পরিবর্তে প্রতিটি স্তরে একটি নির্দিষ্ট একক মূল্য নির্ধারণ এবং পর্যায়ক্রমে চারটি মূল্যস্তরকে একটিতে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞার মতে, এ ধরনের সংস্কার কার্যকর করা গেলে সিগারেটের দাম ও কর বৃদ্ধির প্রভাব আরও স্পষ্ট হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন দামের ব্র্যান্ডের মাধ্যমে ভোক্তাদের কমদামি বিকল্পে চলে যাওয়ার সুযোগ সীমিত করা সম্ভব হবে।

সার্বিকভাবে, জরিপের তথ্য সিগারেটের মূল্যস্তর নির্ধারণের বিদ্যমান পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। তামাকের ব্যবহার কমাতে শুধু কর ও দাম বাড়ানো নয়, বাজারে মূল্য নির্ধারণের কাঠামোও কার্যকর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তামাকবিরোধী সংশ্লিষ্টরা।

সর্বশেষ