উদ্বোধনের পরও পূর্ণাঙ্গ চালু হয়নি চট্টগ্রামের সাইবার পুলিশ সেন্টার

ডিজিটাল আলামত পরীক্ষায় এখনো ঢাকানির্ভরতা, কাজ শুরু করেছেন ৯ কর্মকর্তা

মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম:
spot_img

মো.মোক্তার হোসেন বাবু,চট্টগ্রাম: সাইবার অপরাধ তদন্তে ডিজিটাল আলামত পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের সুবিধা বাড়াতে চট্টগ্রামে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সাইবার পুলিশ সেন্টার উদ্বোধন করা হয়েছে। তবে উদ্বোধনের পরও কেন্দ্রটির পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফরেনসিক ইউনিটে নয়জন কর্মকর্তা যোগ দিয়ে প্রাথমিক কাজ শুরু করলেও সাইবার ইউনিটের জনবল নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়া এখনো চলছে। ফলে ডিজিটাল আলামত পরীক্ষার ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এখনো ঢাকার সংশ্লিষ্ট ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করতে হচ্ছে।

- Advertisement -

গত ১৪ অক্টোবর নগরের খুলশী থানাধীন দামপাড়া পুলিশ লাইনের ভেতরে সিআইডি কার্যালয়ের পাশে সাইবার পুলিশ সেন্টারটি উদ্বোধন করা হয়। কেন্দ্রটি চালুর মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে সাইবার অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা বাড়বে এবং ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণে ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমবে বলে আশা করা হয়েছিল। তবে প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি পুরোপুরি সম্পন্ন না হওয়ায় সেই প্রত্যাশা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

সাইবার অপরাধ তদন্তে মুঠোফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার, হার্ডডিস্ক ও মেমোরি কার্ডের মতো ডিভাইস গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব যন্ত্রে সংরক্ষিত তথ্য বিশ্লেষণ করে অপরাধের ধরন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যোগাযোগ এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। বিশেষায়িত প্রযুক্তির সাহায্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মুছে ফেলা তথ্যও উদ্ধার করা সম্ভব। এসব আলামত পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের জন্য এত দিন চট্টগ্রামের তদন্তকারীদের ঢাকার সংশ্লিষ্ট ইউনিটের সহায়তা নিতে হতো।

রয়েছে ফরেনসিক ল্যাব, চলছে জনবল প্রস্তুতি

চট্টগ্রামে স্থাপিত চারতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ফরেনসিক রিসেপশন, মোবাইল ফরেনসিক ল্যাব ও প্রি-ট্রিটমেন্ট ল্যাব রয়েছে। এসব সুবিধার মাধ্যমে ডিজিটাল আলামত গ্রহণ, প্রাথমিক প্রক্রিয়াকরণ, পরীক্ষা ও বিশ্লেষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু না হওয়ায় কেন্দ্রটির সব সক্ষমতা এখনো কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

সিআইডি চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. সালাহ উদ্দিন বলেন, সাইবার ইউনিটের কার্যক্রম এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে শুরু হয়নি। ফরেনসিক ইউনিটে নয়জন কর্মকর্তা যোগ দিয়েছেন এবং তাঁরা প্রাথমিকভাবে কাজ করছেন। তবে সাইবার ইউনিটের জনবল নিয়োগ ও পদায়ন প্রক্রিয়া চলছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে যেসব কাজ আসছে, সেগুলো ঢাকার সংশ্লিষ্ট ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে সম্পন্ন করা হচ্ছে। জনবল ও প্রয়োজনীয় সেটআপ পুরোপুরি প্রস্তুত হলে চট্টগ্রামে পূর্ণাঙ্গভাবে সাইবার ইউনিটের কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে। দ্রুত কার্যক্রম শুরু করা যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

১৭০ ডিভাইসের তথ্য বিশ্লেষণের প্রয়োজন

সাইবার পুলিশ সেন্টারের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে সাম্প্রতিক কয়েকটি তদন্তও। গত সেপ্টেম্বরে নগরের খুলশী এলাকার একটি আটতলা ভবন থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে মুঠোফোন ও ল্যাপটপসহ ১৭০টি ডিভাইস জব্দ করা হয়েছিল।

সাইবার সুরক্ষা আইনে করা ওই মামলায় জব্দ করা ডিভাইসগুলো পরীক্ষা করে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এসব ডিভাইসে থাকা তথ্য, যোগাযোগের বিবরণ এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উপাত্ত তদন্তে সহায়ক হতে পারে। তবে ওই ১৭০টি ডিভাইসের পরীক্ষা-নিরীক্ষার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।

ট্রাইব্যুনালে এক হাজারের বেশি মামলা

চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাইবার ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে ১ হাজার ১১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ৯৬৭টি মামলা বিচারাধীন। এ ছাড়া চট্টগ্রাম রেঞ্জের ১১ জেলায় চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার আইনে ৫০টি মামলা হয়েছে।

মামলার এই সংখ্যা সাইবার অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় ডিজিটাল আলামতের গুরুত্ব তুলে ধরে। দ্রুত ও নির্ভুলভাবে এসব আলামত পরীক্ষা করা গেলে তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ এবং আদালতে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ উপস্থাপনে সহায়তা পাওয়া যেতে পারে।

আট বিভাগে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা

সাইবার পুলিশ সেন্টারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশের আটটি বিভাগীয় সদর দপ্তরে দ্রুত ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব স্থাপন করা হবে। সাইবার অপরাধ শনাক্ত ও দমনে এসব ল্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

চট্টগ্রামে সাইবার পুলিশ সেন্টার স্থাপনের মধ্য দিয়ে ডিজিটাল অপরাধ তদন্তের স্থানীয় সক্ষমতা বাড়ানোর অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। তবে এর পূর্ণ সুফল পেতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, পদায়ন ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি সম্পন্ন করে নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করা জরুরি। তত দিন পর্যন্ত ডিজিটাল আলামত পরীক্ষায় ঢাকার ওপর নির্ভরতা পুরোপুরি কাটছে না।

সর্বশেষ