সাইবার অপরাধ দমনে সরকারের নতুন উদ্যোগ, বাড়ছে পুলিশের সক্ষমতা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

দেশে ক্রমবর্ধমান সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো ও দক্ষ জনবল তৈরিতে একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব স্থাপন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনের মাধ্যমে অনলাইন অপরাধ দমনে কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

- Advertisement -

সাইবার অপরাধের বিস্তারে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানি, হুমকি, ভুয়া তথ্য প্রচার এবং ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনায় ভুক্তভোগীরা নানা সমস্যার মুখে পড়ছেন। অনেক ক্ষেত্রে এসব অপরাধ পারিবারিক বিরোধ ও সামাজিক অস্থিরতারও কারণ হয়ে উঠছে।

অনলাইন ব্যাংকিং, মোবাইল আর্থিক সেবা এবং ভুয়া ওয়েবসাইট বা লিংক ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে অপরাধীরা। একই সঙ্গে পাসওয়ার্ড, ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি করে সেগুলো বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহার করা হচ্ছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানির ঘটনায় সিআইডিতে আসা মামলাগুলো পেশাদারত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি ও টহল কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।

তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এফটিআই) এবং ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান প্রশিক্ষণে নতুন নতুন বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ সদরদপ্তরের উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু হয়েছে, যেখানে সিআইডির কর্মকর্তারাও অংশ নিচ্ছেন।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধের অভিযোগে জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) ৩২টি এবং সিআর (ক্রিমিনাল রেজিস্টার) ১৫৯টিসহ মোট ১৯১টি মামলা হয়েছে। একই সময়ে এসব অপরাধে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

প্রতারণার নতুন ফাঁদে সর্বস্ব হারাচ্ছেন অনেকে

বিশেষজ্ঞদের মতে, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরনও পরিবর্তিত হচ্ছে। ঘরে বসে খণ্ডকালীন কাজ, ভিডিওতে লাইক দিয়ে আয় কিংবা সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার জালে ফেলা হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে শিক্ষার্থী, গৃহিণী ও বেকার তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। প্রথমে এক থেকে দুই হাজার টাকা বোনাস দিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে প্রতারকরা। পরে বিভিন্ন কাজ বা ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করার নামে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করানো হয়। একপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়ে উধাও হয়ে যায় প্রতারক চক্র।

একটি সমীক্ষার বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক বছরে এ ধরনের আর্থিক প্রতারণায় সাধারণ গ্রাহকরা শত শত কোটি টাকা হারিয়েছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। অপরাধ দমন ও মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে সাইবার অপরাধও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ এসব অপরাধের শিকার হচ্ছেন। ওটিপি আদায়, ভুয়া ফোনকল, ডিপফেক ভিডিও, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে অনেকে সারা জীবনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন। এর ফলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে মানসিক সংকটও তৈরি হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তি ব্যবহারে অসচেতনতা, দুর্বল পাসওয়ার্ড, অপরিচিত লিংকে প্রবেশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ সাইবার অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়। এ ছাড়া ভুয়া তথ্য ও মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়ে সামাজিক বিভ্রান্তি এবং বিরোধ তৈরির ঘটনাও ঘটছে। সাইবার বুলিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ডিএমপির সাইবার অপরাধ তদন্তে জোরদার কার্যক্রম

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, সাইবার অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। এ ধরনের অপরাধ তদন্তের সক্ষমতা বাড়াতে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে। পাশাপাশি কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল অপরাধের মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে রাজধানীর বিভিন্ন বিভাগে সাইবার অপরাধ-সংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলায় ১৬৩ জন, লালবাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারীতে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিলে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন, তেজগাঁওয়ে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন, মিরপুরে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশানে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও সাইবার ও ফরেনসিক ল্যাব

পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিজিটাল ফরেনসিক ও সাইবার ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে চলতি মাসে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১ অক্টোবর ঢাকায় স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠন করা হয়েছে। ইউনিটটিতে ৪ হাজার ৫৯২ জন পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মী রয়েছেন। একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ তদন্তের জন্য পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রয়েছে।

সম্প্রতি মিরপুরে পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্তের ওপর ১০ দিনব্যাপী বিশেষ টিওটি কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

সতর্কতাই সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের প্রথম ধাপ

বিশেষজ্ঞরা অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে পিন বা ওটিপি বিনিময় না করা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ব্যবহার, সন্দেহজনক ফোনকল ও আর্থিক প্রস্তাব যাচাই এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়ানো গেলে সাইবার অপরাধের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

সর্বশেষ