সাভার-আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভ, সংঘর্ষে আহত ১০ পুলিশ সদস্য

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চল। ন্যূনতম মাসিক মজুরি ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ, শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্টিং বন্ধসহ নানা দাবিতে সোমবার সকাল থেকে বিভিন্ন কারখানায় কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে পুলিশের অন্তত ১০ সদস্য আহত হয়েছেন। এ সময় একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

- Advertisement -

সোমবার (২ নভেম্বর) সকাল থেকেই সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের লক্ষণ দেখা যায়। সকাল ৯টার পর নরসিংহপুর, জিরাবো, কাঠগড়া, ঘোষবাগ, উলাইলসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় বেশ কয়েকটি কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে কর্তৃপক্ষ।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে নিউএইজ গ্রুপের শ্রমিকরা কর্মবিরতি শুরু করেন। পরে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তারা কারখানা থেকে বেরিয়ে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেন। এ সময় আশপাশের বিভিন্ন কারখানার সামনে গিয়ে অন্য শ্রমিকদেরও আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

এরপর বিক্ষোভকারীরা হা-মীম গ্রুপের কারখানার সামনে অবস্থান নেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে শ্রমিকদের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। এতে পুলিশের অন্তত ১০ সদস্য আহত হন।

একই সময়ে আশুলিয়ার জিরাবো-কাঠগড়া সড়কের পাশে বেঙ্গল প্লাস্টিক পাইপস লিমিটেডের সামনে প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ করেন। তারা কারখানা লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন এবং ভেতরে থাকা শ্রমিকদের বাইরে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানান। পরে আশপাশের আরও কয়েকটি কারখানার সামনে গিয়ে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা।

এদিকে জিরাবো এলাকার মিনি সাউদার্ন গার্মেন্টসসহ আশপাশের কয়েকটি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। এক শ্রমিক জানান, তারা নিয়মিত কাজ করছিলেন। হঠাৎ আন্দোলনকারীরা কারখানার সামনে আসার পর কর্তৃপক্ষ ছুটি ঘোষণা করে। পরে শ্রমিকরা নিরাপদে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন।

ঘোষবাগে সড়ক অবরোধ, কাভার্ডভ্যানে আগুন

সকাল ১০টার দিকে আব্দুল্লাহপুর-বাইপাইল সড়কের ঘোষবাগ এলাকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে গেলে আবারও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে শ্রমিকরা সড়কের ওপর বিদ্যুতের খুঁটি ফেলে যান চলাচল বন্ধ করে দেন। পরে পুলিশ লাঠিচার্জ ও ধাওয়া দিয়ে তাদের সরিয়ে দেয়।

অন্যদিকে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নরসিংহপুর এলাকায় বিক্ষোভ চলাকালে একটি কাভার্ডভ্যানে আগুন ধরিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। দুপুর ১টার দিকে একই এলাকায় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে। পরে ঘটনাস্থল থেকে দুজনকে আটক করে পুলিশ।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন বলেন, শ্রমিকরা তাদের যৌক্তিক দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলনে নেমেছেন। সরকার ইতোমধ্যে এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছে। তবে পোশাক কারখানায় ভাঙচুর এবং পোশাক খাতের বাইরের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাগুলো সন্দেহজনক। এসব ঘটনার পেছনে কারা রয়েছে, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

আশুলিয়া শিল্পাঞ্চল পুলিশ-১-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মোমিনুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, শ্রমিক অসন্তোষের কারণে বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বাইরে চলে এসেছেন। পাশাপাশি আশপাশের যেসব কারখানায় উৎপাদন চলছিল, সেখান থেকেও শ্রমিকদের বের করে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, নরসিংহপুর এলাকায় শ্রমিকদের নামে রাস্তায় ব্যারিকেড দেওয়া, আগুন জ্বালানো ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শিল্প পুলিশ ও ঢাকা জেলা পুলিশ যৌথভাবে কাজ করছে। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং কারখানায় ভাঙচুর ও নাশকতা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

পুলিশ সুপার আরও জানান, নরসিংহপুর, বিশমাইল ও কাঠগড়া এলাকার অধিকাংশ কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আন্দোলনে বহিরাগত দুষ্কৃতকারীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।

শ্রমিকদের কাজে ফেরার আহ্বান পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে সোমবার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে সাভারের উলাইল এলাকায় আল-মুসলিম গ্রুপের কারখানার সামনে যান ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন ও সাভার মডেল থানার ওসি সাইফুল আলম।

এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের বিষয়ে সরকার ইতোমধ্যে মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। বোর্ড কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাই শ্রমিকদের নিরাপদ পরিবেশে কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে।

তিনি আরও বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের পরও যারা শিল্পাঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের উদ্দেশ্য ভিন্ন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থে বিভিন্ন কারখানার মালিকপক্ষ নিজেরাই ছুটি ঘোষণা করেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় সকাল থেকেই শিল্পাঞ্চলে পুলিশের নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

তিনি দাবি করেন, শ্রমিকদের আন্দোলনের মধ্যে ঢুকে একটি পক্ষ ভাঙচুর ও অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে জড়িতদের শনাক্ত করা হচ্ছে। হেলমেট ও মাস্ক পরে যারা ভাঙচুরে অংশ নিয়েছে, তাদেরও শনাক্ত করার কাজ চলছে। ইতোমধ্যে কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে।

শ্রমিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানিতে সাড়া না দিয়ে কাজে ফিরে আসুন। কারখানায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের। কেউ কাজে বাধা দিলে পুলিশকে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করার আহ্বান জানান তিনি।

শিল্পাঞ্চলের চলমান অস্থিরতায় একদিকে যেমন উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে সড়ক অবরোধ ও যানবাহনে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সাধারণ মানুষের চলাচলেও বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে শিল্পাঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

সর্বশেষ