ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন করে সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। সদ্য অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কোনো জোটই এককভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ সাজাচ্ছে বিরোধী দলগুলো। এরই মধ্যে বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকোটকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী করার পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন নাফতালি বেনেট ও ইয়াইর গোলান।
তবে সরকার গঠনে আরব রাজনৈতিক দল এবং অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলোর সমর্থন নেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে বিরোধী শিবিরে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। ফলে আইজেনকোটের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণে সরকার গঠিত হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি।
দ্য টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোববার নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোর মধ্যে সরকার গঠনের কৌশল ও নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা অব্যাহত ছিল। নির্বাচনের পরবর্তী পরিস্থিতিতে ক্ষমতায় যেতে হলে বিরোধী দলগুলোকে কয়েকটি কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি এবং সরকার গঠনের বাস্তব প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় করতে হচ্ছে তাদের।
বিরোধী জোটের গুরুত্বপূর্ণ নেতা গাদি আইজেনকোট প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বেশ এগিয়ে গেছেন। বিয়াখাদ পার্টির প্রধান নাফতালি বেনেট জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আইজেনকোটকে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করবেন। একই অবস্থান জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়াইর গোলান।
বেনেটের দল এক বিবৃতিতে বলেছে, নির্বাচনি প্রচারণার সময় থেকেই ভোটারদের রায়কে সম্মান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। এখন সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ীই আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানানো হচ্ছে।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্য নিয়ে গঠিত চারটি জায়নবাদী দলের ‘চেঞ্জ ব্লক’-এ আইজেনকোটের ইয়াশার পার্টি পেয়েছে ২১টি আসন। বেনেটের বিয়াখাদ পার্টির আসনসংখ্যা ১২। অন্যদিকে ইয়াইর গোলানের ডেমোক্র্যাটস পার্টি পেয়েছে আটটি আসন। এ ছাড়া বিরোধী জোটের আরেক শরিক আভিগদর লিবারম্যানের ইসরায়েল বেইতেনু পার্টির রয়েছে সাতজন সংসদ সদস্য।
জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে লিবারম্যানের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে শনিবার তার সঙ্গে বৈঠক করেছেন আইজেনকোট। পাশাপাশি বেনেট ও গোলানের সঙ্গেও কয়েক দফা আলোচনা করেছেন তিনি। রোববার বেনেটের দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতা ইয়াইর লাপিদের সঙ্গেও লিবারম্যানের বৈঠকের কথা ছিল।
তবে সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে আইজেনকোট ও লিবারম্যানের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনের সম্ভাবনাকে শুরু থেকেই প্রত্যাখ্যান করে আসছেন লিবারম্যান। তার মতে, সংখ্যালঘু সরকারের ধারণা সামনে আনার কারণে নির্বাচনে বিরোধী জোট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবারের বৈঠকেও আইজেনকোটের নির্বাচনি কৌশলের সমালোচনা করেছেন তিনি বলে জানিয়েছে হিব্রু ভাষার সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট।
এদিকে বিরোধী জোটের নেতারা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যৌথ বৈঠকে বসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য নেসেটের বর্তমান স্পিকার এবং নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির সদস্য আমির ওহানাকে পদ থেকে সরানো। এর মাধ্যমে আইনসভার কার্যক্রমের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায় বিরোধী জোট।
এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে চালানো হামলার আগে ও পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কী ধরনের ব্যর্থতা ছিল, তা তদন্তে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগও নিতে পারে তারা।
তবে নতুন স্পিকার নির্বাচন নিয়ে বিরোধী দলগুলোর মধ্যে জটিলতা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েলের ১২০ সদস্যের নেসেটে স্পিকার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ৯০ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হওয়ায় বিষয়টি সহজ হবে না। একবার নতুন স্পিকার নির্বাচিত হলে তাকে সরানোও কঠিন হয়ে পড়বে।
আইজেনকোট নিজেও স্পিকার পদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তবে তিনি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে না। সে ক্ষেত্রে অন্য কাউকে ওই পদে বসানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। এ নিয়ে লিবারম্যান আপত্তি জানিয়েছেন বলে ওয়াইনেটের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মতে, আইজেনকোটের দলের সংসদ সদস্যদের স্পিকার হওয়ার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মহল থেকেও বিরোধী জোটকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, আমির ওহানাকে স্পিকারের পদ থেকে সরানোর চেষ্টা অব্যাহত থাকলে লিকুদ পার্টিকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের আলোচনা এগোবে না বলে আইজেনকোটকে জানানো হয়েছে।
তবে আইজেনকোটের ঘনিষ্ঠরা জানিয়েছেন, ওহানাকে সরানোর উদ্যোগ থেকে তারা সরে আসছেন না। নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন সরকারে যোগ দেওয়ারও কোনো পরিকল্পনা নেই তাদের।
এদিকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক পদে নতুন নির্বাচন আয়োজনের বিষয়টিও বিরোধী জোটের আলোচনায় রয়েছে। চ্যানেল ১২ নিউজের তথ্য অনুযায়ী, সংসদ সদস্যদের ভোটের মাধ্যমে দ্রুত এ পদে নতুন নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে পারে তারা।
সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ হয়ে উঠেছে অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলোর অবস্থান। বিশেষ করে ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম (ইউটিজে) পার্টির সমর্থন পেলে বিরোধী জোটের জন্য সরকার গঠনের পথ কিছুটা সহজ হতে পারে। দলটি ইতোমধ্যে জানিয়েছে, তারা আর নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ নয়।
রোববার নিজেদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে বৈঠক করেছেন ইউটিজের নেতারা। বৈঠকে দলটির প্রধান ও সংসদ সদস্য ইয়াকভ আশেরের পাশাপাশি ইৎজহাক গোল্ডকনফ ও মেইর পোরুশ উপস্থিত ছিলেন। হিব্রু সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীকেই আপাতত সমর্থনের সুপারিশ না করার বিষয়টি বিবেচনা করছে দলটি।
একসময় নেতানিয়াহুর জোটের অন্যতম নির্ভরযোগ্য শরিক হিসেবে পরিচিত ছিল ইউটিজে। তবে গত চার বছরে অতি-ধর্মীয় ইহুদি শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আইন পাস করতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্ষমতাসীন জোটের ওপর ক্ষুব্ধ দলটির নেতারা।
ইউটিজের নেতারা জানিয়েছেন, আইজেনকোটের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আসেনি। ফলে সরকার গঠন নিয়ে আলোচনারও সুযোগ তৈরি হয়নি।
এদিকে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ নেসেটের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এসব বৈঠকে দলগুলো পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাদের পছন্দের প্রার্থীর নাম সুপারিশ করবে। এরপর সরকার গঠনের দায়িত্ব কাকে দেওয়া হবে, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সব মিলিয়ে ইসরায়েলের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা এখন নির্ভর করছে বিরোধী জোটের অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য, আরব দলগুলোর সমর্থন এবং অতি-ধর্মীয় ইহুদি দলগুলোর অবস্থানের ওপর। নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটাতে বিরোধীরা একজোট হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের মধ্যে সমঝোতা কতটা সম্ভব হয়, সেটিই এখন দেশটির রাজনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

