ইসরায়েলকে প্রতিবছর দেওয়া ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা চলতি বছরের শেষ নাগাদ বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে সামরিক সহায়তা বন্ধ হলেও ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখবে ওয়াশিংটন। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা জানান তিনি। খবর রয়টার্সের।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ফক্স নিউজের ‘ফক্স অ্যান্ড ফ্রেন্ডস’ অনুষ্ঠানে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে কয়েক মাস আগেই এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষ্য, ইসরায়েলের অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দেশটির আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে প্রতিবছর এত বিপুল পরিমাণ অর্থ সহায়তা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ ছাড়া ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সমালোচনার কারণ হয়ে উঠেছে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ইসরায়েলকে প্রতিবছর ৪০০ কোটি ডলার দেওয়া হয়। কয়েক মাস আগেই এই অর্থ সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে দেশটির প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা করবে।
তবে ট্রাম্পের ঘোষণার সঙ্গে দুই দেশের বিদ্যমান চুক্তির কিছুটা অসামঞ্জস্য রয়েছে। ২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ২০২৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিবছর ইসরায়েলকে ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। কীভাবে নির্ধারিত সময়ের আগেই এই সহায়তা বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সামরিক সহায়তার বিষয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় দলের সমর্থন ছিল। তবে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ইসরায়েলের প্রতি সমর্থন কমতে শুরু করেছে।
কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের গত জুনের এক জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৮ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ইসরায়েলকে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি সমর্থন দিচ্ছে ওয়াশিংটন। ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে এই মতের হার ৬৬ শতাংশ। ২০১৭ সালে একই প্রশ্নে এই হার ছিল যথাক্রমে ১৬ ও ২০ শতাংশ।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের দিন ট্রাম্পের এমন ঘোষণা রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনার পাশাপাশি রিপাবলিকান শিবিরেও বিষয়টি নিয়ে হিসাব-নিকাশ বাড়ছে।
ট্রাম্পের ঘোষণার সমালোচনা করেছেন ইসরায়েলের বিরোধী রাজনৈতিক জোটের নেতা গাদি আইজেনকট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবর্তনের খবর ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারছেন। তাঁর মতে, এটি নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গত অক্টোবরে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে ইসরায়েলকে মানিয়ে নিতে হবে এবং আগের মতো বিপুল পরিমাণ সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে।
অন্যদিকে, সামরিক সহায়তা কমানোর আলোচনার মধ্যেই দুই দেশের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৭ সালের প্রতিরক্ষা বাজেটসংক্রান্ত বিলে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাব রাখা হয়েছে। তবে কয়েক ডজন বেসরকারি সংস্থা প্রস্তাবটির বিরোধিতা করে একে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছে।
উল্লেখ্য, ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের উত্তেজনার মধ্যেই ট্রাম্পের এ ঘোষণা দুই দেশের দীর্ঘদিনের সামরিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করেছে।

