সংবাদ প্রকাশ বা প্রচারের জেরে কোনো সাংবাদিক, গণমাধ্যমের মালিক কিংবা দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে হলে আগে সংশ্লিষ্ট আদালতের অনুমতি নেওয়ার বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়ায়। সাংবাদিক ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে এ বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিসভা কমিটির সদস্যরা।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সচিবালয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সভাকক্ষে সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়া পর্যালোচনা ও চূড়ান্তকরণে গঠিত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
বৈঠকে গণমাধ্যমকর্মী ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে আইনের খসড়া সংশোধনের ওপর জোর দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, সাইবার অপরাধ নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রণীত আইন যেন সাংবাদিকদের হয়রানি কিংবা স্বাধীন সাংবাদিকতার পথে বাধা সৃষ্টির মাধ্যম হয়ে না ওঠে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
আলোচনায় মানহানি, হেয় প্রতিপন্ন করা এবং সাইবার বুলিংয়ের বিষয়গুলো আলাদা করে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব আসে। একই সঙ্গে সাইবার স্পেসের সংজ্ঞা আরও নির্দিষ্ট করার বিষয়েও মতামত দেওয়া হয়। মানহানির সংজ্ঞা ও শাস্তির ক্ষেত্রে প্রচলিত দণ্ডবিধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
এ ছাড়া গুজব ও অপতথ্যের সংজ্ঞা স্পষ্ট করার বিষয়টি আলোচনায় স্থান পায়। আইনের অস্পষ্ট কিংবা অতিব্যাপক সংজ্ঞার সুযোগে যাতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন অংশগ্রহণকারীরা।
খসড়া থেকে মোবাইল কোর্টের বিধান বাদ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি কোনো অনলাইন কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কিংবা প্রতিষ্ঠানকে সিদ্ধান্তের কারণ জানানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়। ব্লক করা কনটেন্ট পুনরায় চালুর আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা রাখার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কোনো সংবাদমাধ্যম বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে লিখিত নোটিশ দেওয়া এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করার প্রস্তাবও বৈঠকে উত্থাপন করা হয়।
এদিকে সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের সদস্য কাঠামোতে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং মেটার মতো আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে আলোচনা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে সংশোধিত খসড়াটি অংশীজনদের মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে আরও পরিমার্জন করে ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিষয়েও আলোচনা হয়। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মতামত নিয়ে আইনটিকে আরও কার্যকর, গ্রহণযোগ্য ও সময়োপযোগী করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সভায় বক্তারা মত দেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধের পাশাপাশি নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। সব পক্ষের গঠনমূলক পরামর্শ বিবেচনায় নিয়েই আইনটির চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার কথা জানান তারা।
বৈঠকে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির পক্ষ থেকে একটি উপস্থাপনা তুলে ধরা হয়। এ সময় আইসিটি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব ড. মো. কামরুজ্জামানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

