আইন পেশায় সাফল্য অর্জনের জন্য শুধু অর্থ উপার্জন নয়, বরং সততা, পেশাগত দক্ষতা, মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তাঁর মতে, একজন আইনজীবীর প্রধান দায়িত্ব হলো মক্কেলের আর্থিক সামর্থ্য বিবেচনা না করে যথাযথ আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশের (আইইউবি) অডিটোরিয়ামে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনবিষয়ক ১৭তম হেনরি ডুনান্ট মেমোরিয়াল মুট কোর্ট প্রতিযোগিতা-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) ও আইইউবি যৌথভাবে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে।
আইনমন্ত্রী বলেন, কোনো ব্যক্তি বিপদে পড়ে আইনজীবীর কাছে গেলে নিজের আস্থা, বিশ্বাস, প্রত্যাশা ও স্বপ্ন তাঁর হাতে তুলে দেন। তাই মক্কেলের আর্থিক সামর্থ্যকে গুরুত্ব না দিয়ে তাঁর পক্ষে যথাযথ আইনি যুক্তি উপস্থাপন এবং পেশাগত দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করাই একজন আইনজীবীর প্রধান কর্তব্য।
তিনি বলেন, আইন পেশা অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং। এ ক্ষেত্রে সফল হতে হলে পূর্ণকালীন অঙ্গীকার, পেশাদারত্ব, অধ্যবসায় ও গবেষণার বিকল্প নেই। আদালতে প্রতিটি শব্দ ও যুক্তির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই নির্ভুল তথ্য এবং শক্তিশালী আইনি যুক্তি উপস্থাপনের জন্য আইনজীবীদের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও গবেষণা থাকতে হবে।
মো. আসাদুজ্জামান আরও বলেন, একজন আইনজীবীর কাছে মক্কেলের দেওয়া পারিশ্রমিকের চেয়ে তাঁর পক্ষে যথাযথ আইনি যুক্তি তুলে ধরতে পারা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তা দেওয়াকে আইনজীবীদের পেশাগত জাকাত হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, আইন পেশায় মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্ববোধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পরিবর্তিত বিশ্বে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও মানবাধিকারের মধ্যে পার্থক্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, মানবাধিকার মানুষের মৌলিক অধিকার নিয়ে বিস্তৃতভাবে কাজ করে। অন্যদিকে, যুদ্ধ কিংবা সশস্ত্র সংঘাতের পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রয়োগের বিষয়টি সামনে আসে।
তিনি বলেন, সময়ের সঙ্গে যুদ্ধের ধরন, ভাষা ও কৌশলে পরিবর্তন এসেছে। আগে যুদ্ধের প্রধান উপকরণ ছিল অস্ত্র, বোমা ও গুলি। কিন্তু বর্তমানে অর্থনৈতিক চাপ, বাণিজ্যিক বিরোধ, বাণিজ্য বন্ধ এবং ভিসা বিধিনিষেধের মতো বিষয়ও রাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) বিকাশ নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রয়োগ, দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।
তরুণদের নেতৃত্ব গ্রহণের আহ্বান
তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি প্রজন্মের নিজস্ব স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও দায়িত্ব রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষা ও দায়িত্বের প্রতিফলন।
তরুণদের মেধা, প্রজ্ঞা, যুক্তি, পরিশ্রম ও অঙ্গীকারের মাধ্যমে দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ে তুলতে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক এম. তামিম সভাপতিত্ব করেন। এ সময় বক্তব্য দেন বিশ্ববিদ্যালয়টির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারম্যান দিদার এ হোসেন, বাংলাদেশে আইসিআরসির হেড অব ডেলিগেশন নিকোলাস ফ্লুরি এবং আইইউবির স্কুল অব ল-এর উপদেষ্টা অধ্যাপক বোরহান উদ্দিন খান।
প্রতিযোগিতায় দেশের ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৯টি দল অংশগ্রহণের জন্য লিখিত আইনি যুক্তি ও গবেষণাপত্র জমা দেয়। সেখান থেকে বাছাই করা ১৬টি দল কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে।
মুট কোর্ট প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, সশস্ত্র সংঘাতের সময় মানবিক সুরক্ষা এবং আইনের প্রয়োগ সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক ধারণা লাভের পাশাপাশি গবেষণা, বিশ্লেষণ ও যুক্তি উপস্থাপনের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে।

