রাজধানী ঢাকায় ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনটি পৃথক স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার মধ্যে একটি বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের কাভার্ড ভ্যানে পরিকল্পিতভাবে আগুন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া সেগুনবাগিচায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একটি পরিত্যক্ত স্টাফ বাস এবং বাড্ডার নতুন বাজার এলাকায় বৈশাখী পরিবহনের একটি বাসে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় নগরীর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাত থেকে শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে রায়েরবাজারে এ জে আর কুরিয়ার সার্ভিসের কাভার্ড ভ্যানে আগুনে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, আগুনে প্রায় এক থেকে দেড় কোটি টাকার মালামাল ও গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র পুড়ে গেছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি দুর্বৃত্ত চক্র তাদের কাছে চাঁদা দাবি করে আসছিল। দাবি পূরণ না করায় বিভিন্ন সময়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়, ওয়্যারহাউস ও যানবাহনে হামলা চালানো হয়েছে।
এ জে আর গ্রুপের এজিএম জয়ন্ত চৌধুরী জানান, চাঁদা না দেওয়ায় নারায়ণগঞ্জে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এরপর শাহবাগ ও রায়েরবাজারে যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এমনকি মিরপুরে পেট্রলবোমা নিক্ষেপ করে প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীর শরীরে আগুন দিয়ে তাঁকে হত্যার চেষ্টাও করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, রায়েরবাজারে কাভার্ড ভ্যানে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় বিভিন্ন গ্রাহক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানের মালামাল এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র নষ্ট হয়েছে। প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী ক্ষতির পরিমাণ দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সব নথিপত্র ও মালামালের মূল্যায়ন শেষ হলে প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে।
জয়ন্ত চৌধুরীর ভাষ্য, ধারাবাহিক হামলার কারণে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি কর্মীদের চাকরির নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ চান তাঁরা। একই সঙ্গে এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুল হালিম জানান, কাভার্ড ভ্যানে আগুন দেওয়ার ঘটনায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মামলা করার প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, হেলমেট পরা কয়েকজন ব্যক্তি এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন। তাঁদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ করছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে শুক্রবার দুপুরে সেগুনবাগিচায় ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় প্রাঙ্গণে এনবিআরের একটি পরিত্যক্ত স্টাফ বাসে আগুন লাগে। বেলা ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে আগুনের সূত্রপাত হলে কার্যালয়ের কর্মচারীরা দ্রুত তা নিয়ন্ত্রণে আনেন। ফলে আগুন আশপাশে ছড়িয়ে পড়েনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপকমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম জানান, প্রাথমিকভাবে ফেলে দেওয়া সিগারেটের অবশিষ্টাংশ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
একই দিন বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বাড্ডার নতুন বাজার এলাকায় বৈশাখী পরিবহনের আরেকটি বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। কোকা-কোলা গেটের বিপরীত পাশে বাসটি ঘোরানোর সময় কয়েকজন ব্যক্তি আগুন লাগিয়ে পালিয়ে যান বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভাটারা থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। বাসটিতে কোনো যাত্রী না থাকায় হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। কারা এ অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত ২০ অক্টোবর রাজধানীর হাজারীবাগে এ জে আর পার্সেল অ্যান্ড কুরিয়ার সার্ভিস লিমিটেডের একটি ওয়্যারহাউসে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রতিষ্ঠানটির অভিযোগ, ওই সময় প্রায় ৩১ লাখ টাকা মূল্যের সরঞ্জাম লুট করা হয়েছিল। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানের মানবসম্পদ ও প্রশাসন বিভাগের ব্যবস্থাপক আফসার উদ্দিন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পরে মামলা করায় তাঁকে মুঠোফোনে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তাদের দাবি, চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে একটি সন্ত্রাসী চক্র বিভিন্ন সময়ে তাদের স্থাপনা ও যানবাহনে হামলা চালাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ওয়্যারহাউস ভাঙচুর, গাড়িতে হামলা, হুমকি ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে।
রাজধানীতে একই সময়ের মধ্যে একাধিক যানবাহনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের ওপর ধারাবাহিক হামলার অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

