মেধাবী শিশুদের হ্যাকার বানাচ্ছে উত্তর কোরিয়া, সাইবার হামলায় কিমের বড় পরিকল্পনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

বিশ্বজুড়ে সাইবার হামলা চালিয়ে বিপুল অর্থ ও কৌশলগত সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি পরিচালনা করছে উত্তর কোরিয়া। দেশটির নেতা কিম জং উনের নির্দেশনায় ছোটবেলা থেকেই মেধাবী শিশুদের বাছাই করে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ হ্যাকার হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। বিনিময়ে তাদের জন্য রাখা হয়েছে বিলাসবহুল আবাসন, বিপুল অর্থ পুরস্কার, বিদেশ ভ্রমণ এবং ক্ষমতাসীন দলের সদস্য হওয়ার মতো বিশেষ সুযোগ-সুবিধা।

- Advertisement -

সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্রতিষ্ঠান বাইন্যান্সে সাইবার হামলার মাধ্যমে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলার চুরির অভিযোগ উঠেছে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এবং বাইন্যান্স এ ঘটনার জন্য পিয়ংইয়ংকে দায়ী করেছে। ব্লকচেইন বিশ্লেষকদের ধারণা, ‘ট্রেডারট্রেইটর’ নামে উত্তর কোরিয়ার একটি হ্যাকার গোষ্ঠী এ হামলার সঙ্গে জড়িত। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে উত্তর কোরিয়া। খবর রয়টার্সের।

উত্তর কোরিয়ার সাইবার সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা অবশ্য নতুন নয়। ১৯৯৮ সালে দেশটি প্রথম সাইবার ইউনিট গঠন করে। তবে কিম জং উন ক্ষমতায় আসার পর এ কর্মসূচিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। ২০১৩ সালে তিনি সাইবার যুদ্ধকে পারমাণবিক অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আঘাত হানার সক্ষমতা হিসেবে বর্ণনা করেন।

দক্ষিণ কোরিয়ায় আশ্রয় নেওয়া উত্তর কোরিয়ার সাবেক হ্যাকার প্রশিক্ষক কিম হিউং-কোয়াংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ১১ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুদের মধ্য থেকে প্রতিবছর প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে বাছাই করা হয়। তাদের কম্পিউটারবিজ্ঞান, প্রকৌশল ও গণিতের ওপর বিশেষ শিক্ষা দেওয়া হয়। ১৭ বছর বয়সে মেধার ভিত্তিতে নির্বাচিতদের দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে একাধিক ধাপের যাচাই শেষে যোগ্যদের সামরিক সাইবার ইউনিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীদের ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রযুক্তি, বিদেশি প্রযুক্তিপণ্যের সফটওয়্যার বিশ্লেষণ, উন্নত গণিত এবং বিভিন্ন বিদেশি ভাষা শেখানো হয়। যারা সরাসরি সাইবার হামলায় যুক্ত হয় না, তাদের বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য দূর থেকে সফটওয়্যার ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরির কাজে দক্ষ করে তোলা হয়।

কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক লিম জং-ইনের মতে, উত্তর কোরিয়া দেশের সবচেয়ে মেধাবী তরুণদের পারমাণবিক ও সাইবার কর্মসূচিতে কাজে লাগাচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ায় মেধাবীরা চিকিৎসাসহ বিভিন্ন পেশায় ক্যারিয়ার গড়তে আগ্রহী।

হ্যাকারদের জন্য বিশেষ পুরস্কার

উত্তর কোরিয়ার সাইবার ইউনিটে কাজ করা ব্যক্তিদের আকৃষ্ট করতে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। সফল সাইবার অভিযানে অর্জিত অর্থের সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সামরিক ইউনিটের জন্য বরাদ্দ হতে পারে। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবে হ্যাকারদের ডলার পুরস্কার, রাজধানী পিয়ংইয়ংয়ে ফ্ল্যাট এবং পরিবারের সদস্যদের সেখানে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়।

কোনো কোনো হ্যাকারকে প্রায় ১৩২ বর্গমিটার আয়তনের আবাসন দেওয়া হয়। পাশাপাশি চীনের মতো মিত্র দেশে ভ্রমণ, ক্ষমতাসীন দলের সদস্যপদ অর্জন এবং প্রভাবশালী পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ার সুযোগও রয়েছে। তবে এসব সুবিধা মূলত সফল ও নির্বাচিত অল্পসংখ্যক হ্যাকার পেয়ে থাকেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, উত্তর কোরিয়ার সাইবার যুদ্ধ কার্যক্রমে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ জন কাজ করছেন। লাজারাস গ্রুপসহ দেশটির একাধিক হ্যাকার গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির অভিযোগ উঠেছে।

রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ছে সাইবার ঝুঁকি

বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। সাধারণ সাইবার অপরাধীরা কোনো হামলায় ব্যর্থ হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত হ্যাকার গোষ্ঠীগুলো ব্যর্থতার পরও নতুন করে অভিযান চালানোর সুযোগ পায়।

ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিসের কর্মকর্তা অ্যালেক জেব্রিক বলেন, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা রাষ্ট্রের হয়ে কাজ করায় তাদের কার্যক্রম সাধারণ অপরাধীদের মতো নয়। ফলে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং কার্যক্রম বন্ধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া এসব হ্যাকার বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুযোগ পেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিও ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। চাকরির আবেদন তৈরি, জীবনবৃত্তান্ত লেখা, সফটওয়্যার কোড তৈরি এবং ভুয়া পরিচয়পত্র বানানোর মতো কাজেও এ প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা গেছে।

বাইন্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের কম্পিউটারে ক্ষতিকর সফটওয়্যার প্রবেশ করিয়েছিল হ্যাকাররা। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থায় প্রবেশের সুযোগ তৈরি হয়।

সুযোগ-সুবিধার আড়ালে কঠোর নিয়ন্ত্রণ

হ্যাকারদের জন্য আকর্ষণীয় পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকলেও তাদের ব্যক্তিগত জীবন মোটেও স্বাধীন নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, সীমিত আবাসন, সার্বক্ষণিক নজরদারি এবং নির্ধারিত আয়ের লক্ষ্য পূরণের চাপের মধ্যে থাকতে হয় এসব কর্মীকে।

মানবাধিকার সংগঠন পিসকোরের নির্বাহী পরিচালক নাম বাদা জানিয়েছেন, নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলে কর্মীদের অপমান ও শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। অতিরিক্ত কাজের চাপ থেকে তাদের মধ্যে শারীরিক ও মানসিক সমস্যাও তৈরি হচ্ছে।

সব মিলিয়ে উত্তর কোরিয়া সাইবার প্রযুক্তিকে শুধু নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষার উপকরণ হিসেবে নয়, বরং অর্থ উপার্জন ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারের কৌশল হিসেবেও ব্যবহার করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নতুন প্রজন্মের হ্যাকার তৈরির এ কর্মসূচি বিশ্বব্যাপী আর্থিক প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি ও ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতের নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।

সূত্র: রয়টার্স

সর্বশেষ