মা, আগামীকাল সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাব, দোয়া কইরো।’ মায়ের সঙ্গে এটাই ছিল সেনাসদস্য তিতাস শেখের শেষ কথা। ছেলে অভিযানে যাচ্ছে শুনে মা রেখা বেগম দোয়া করেছিলেন। কিন্তু সেই অভিযান থেকেই আর জীবিত ফিরে আসবেন না সন্তান—এমনটা কল্পনাও করেননি তিনি। এখন ছেলের বলা শেষ কথাগুলোই বারবার মনে পড়ছে তাঁর। সন্তানের মৃত্যুতে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা।
একইভাবে স্বামীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার। অন্যদিকে বড় ছেলেকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে গেছেন বাবা আফজাল শেখ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের পরিবেশ।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) কক্সবাজারের টেকনাফে মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন তিতাস শেখ (২৮)। শুক্রবার (৬ নভেম্বর সন্ধ্যায়) জানাজা ও সামরিক মর্যাদায় শেষ বিদায়ের পর পারিবারিক কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।
তিতাসের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শেষবারের মতো তাঁকে দেখতে ভিড় করেন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। মা-বাবা ও স্ত্রীর কান্নায় শোকাবহ হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নগরকান্দা উপজেলার লস্করদিয়া গ্রামের বাসিন্দা তিতাস ছিলেন আফজাল শেখ ও রেখা বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড়। তাঁদের পরিবারে দীর্ঘদিন ধরেই সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে। বাবা আফজাল শেখ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। ছোট ভাই আকাশ শেখও বর্তমানে সেনাসদস্য হিসেবে কর্মরত।
২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সৈনিক পদে যোগ দিয়েছিলেন তিতাস। তিনি সেনাবাহিনীর ১ বীর ইউনিটের সদস্য হিসেবে টেকনাফের রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পে দায়িত্ব পালন করছিলেন। দুই মাসের ছুটি শেষে গত ২৮ সেপ্টেম্বর কর্মস্থলে যোগ দেন তিনি।
চার বছর আগে পাশের গ্রামের সুমাইয়া আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিতাস। আগামী ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে কর্মস্থলে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল তাঁর। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন এই তরুণ সেনাসদস্য।
স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন সুমাইয়া। বারবার বিলাপ করে তিনি বলছেন, ‘আমাকেও নিয়ে যাও, আমি কেমনে থাকব! আমার কোনো অস্তিত্ব রইল না! আল্লাহ, আমি এখন কী করব!’ স্বজনেরা তাঁকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেও কিছুতেই থামছে না তাঁর কান্না।
ছেলের শেষ কথার স্মৃতিচারণা করে মা রেখা বেগম জানান, গত বুধবার রাতে তিতাসের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছিল। সেদিন ছেলে জানিয়েছিলেন, পরদিন বিকেলে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানে যাবেন। মায়ের কাছে দোয়া চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই কথোপকথনই যে সন্তানের সঙ্গে শেষ কথা হয়ে থাকবে, তা বুঝতে পারেননি রেখা বেগম।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে টেকনাফে মানব পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে যৌথবাহিনীর অভিযান চলছিল। এ সময় পাহাড়ি সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হন তিতাস। তাঁর বুকের বাঁ পাশে গুলি লাগে।
পরে তাঁকে লেদা আইআরসি রোহিঙ্গা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বেসামরিক অ্যাম্বুলেন্সে করে রামু সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। সেখানে জরুরি বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার রাতে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
শুক্রবার বিকেল ৪টা ৪১ মিনিটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে তিতাসের মরদেহ নগরকান্দা উপজেলা সদরের মাহেন্দ্র নারায়ণ একাডেমি মাঠে পৌঁছায়। পদ্মা সেনানিবাস ক্যাম্পের ১৫ রিভারাইন ইঞ্জিনিয়ার ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক মেজর সোহেল আহমেদের নেতৃত্বে একটি দল মরদেহ গ্রহণ করে। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর গ্রামের বাড়ি লস্করদিয়া আতিকুর রহমান উচ্চবিদ্যালয় মাঠে।
মাগরিবের নামাজের পর সেখানে তিতাসের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মরদেহ বাড়িতে নেওয়া হলে স্বজনদের আহাজারিতে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সন্ধ্যা ৭টার দিকে লস্করদিয়া পশ্চিমপাড়া কবরস্থানে দাদির কবরের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
দাফন শেষে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে তাঁকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। সমাধিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের পর সাতজন সেনাসদস্য তিন দফায় ২১টি ফাঁকা গুলি ছুড়ে সহকর্মীকে শেষ সামরিক সালাম জানান।
জানাজার আগে পরিবারের পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন তিতাসের মামা ও লস্করদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বাবুল তালুকদার। ভাগনের জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে তিনি বলেন, ‘দেশকে এমন জায়গায় নিয়ে যেতে হবে, যেখানে আর কারও সন্তানকে এভাবে প্রাণ দিতে না হয়। কারও মায়ের বুক যেন খালি না হয়।’
এ সময় রঙ্গীখালী আর্মি ক্যাম্পের ১ বীর ইউনিটের ক্যাপ্টেন সাজিদ, নগরকান্দা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সামদানি রাসুল আযাদ, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) খায়রুল হাসানসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
একটি অভিযানে দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ হারালেন ২৮ বছর বয়সী তিতাস। রেখে গেলেন শোকাহত মা-বাবা, স্ত্রী ও স্বজনদের। ডিসেম্বর মাসে স্ত্রীকে কাছে নেওয়ার যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা আর পূরণ হলো না। লস্করদিয়ার পারিবারিক কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন এই সেনাসদস্য।

