রাজধানীর ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি মনোরেল রুট নির্মাণের পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রাথমিক পর্যায়ের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে। বর্তমানে প্রস্তাবিত রুটগুলোর বিস্তারিত নকশা তৈরির কাজ চলছে।
ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) উদ্যোগে নেওয়া এ পরিকল্পনায় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সঙ্গে বিদ্যমান ও নির্মাণাধীন মেট্রোরেলসহ অন্যান্য গণপরিবহন ব্যবস্থার সংযোগ স্থাপনের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মনোরেল চালু হলে যাত্রীদের যাতায়াত সহজ হওয়ার পাশাপাশি গণপরিবহন নেটওয়ার্ক আরও সমন্বিত হবে।
ডিটিসিএর অতিরিক্ত নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মশিউর রহমান জানান, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে মনোরেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এটি পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পরিবহনব্যবস্থা হিসেবে যেসব এলাকায় যাত্রীদের চাপ বেশি, সেখানে যোগাযোগের নতুন সুযোগ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত মনোরেল রুটগুলো মেট্রোরেল ও অন্যান্য গণপরিবহনের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে মেট্রোরেল থেকে নেমে যাত্রীদের গন্তব্যের শেষ অংশে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।
ডিটিসিএ সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ব্যুরো অব রিসার্চ, টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন (বিআরটিসি) ইতোমধ্যে প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন করেছে। এখন বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে নকশা জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
প্রস্তাবিত পাঁচটি রুটের মধ্য থেকে কারিগরি, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত দিক বিবেচনা করে চূড়ান্ত দুটি রুট নির্বাচন করা হবে। যাত্রীদের সম্ভাব্য চাহিদা, নির্মাণ ব্যয়, আর্থিক সক্ষমতা ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সুফলও মূল্যায়ন করা হবে।
হালনাগাদ সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) ঢাকার জন্য প্রায় ৭৯ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি মনোরেল রুটের প্রস্তাব রয়েছে। এগুলো হলো—
১. পূর্বাচল ও জলসিঁড়ি হয়ে বিমানবন্দর-বসুন্ধরা, দৈর্ঘ্য ২৫ দশমিক ২ কিলোমিটার।
২. মধ্য বাড্ডা-ভুলতা, দৈর্ঘ্য ১৪ দশমিক ৬ কিলোমিটার।
৩. রামপুরা-ডেমরা, দৈর্ঘ্য ১০ দশমিক ৩ কিলোমিটার।
৪. মোহাম্মদপুর-পোস্তগোলা, দৈর্ঘ্য ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার।
৫. উত্তরা সেন্টার হয়ে বিমানবন্দর-সাভার, দৈর্ঘ্য ১৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার।
এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি থেকে কামরাঙ্গীরচর পর্যন্ত মনোরেল-৮, আলুব্দী থেকে পশ্চিম আগারগাঁও অথবা শ্যামলী পর্যন্ত মনোরেল-১০ এবং পল্টন থেকে সদরঘাট অথবা ঝিলমিল পর্যন্ত মনোরেল-১৩ নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে। এসব রুটে বিভিন্ন সংখ্যক স্টেশন রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, মনোরেল নির্মাণের জন্য যেসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে রয়েছে জনসংখ্যার ঘনত্ব, সম্ভাব্য যাত্রীসংখ্যা, স্টেশনগুলোর আশপাশের যাত্রী চলাচল, যানজটের মাত্রা এবং বিদ্যমান গণপরিবহন সুবিধা। পাশাপাশি ডিপো নির্মাণের জন্য জমির প্রাপ্যতা ও ভবিষ্যতে রুট সম্প্রসারণের সুযোগও যাচাই করা হচ্ছে।
এ সমীক্ষার আওতায় প্রস্তাবিত রুটের অবস্থান, স্টেশন ও ডিপোর সম্ভাব্য স্থান, যাত্রীচাহিদা, অবকাঠামোগত উপযোগিতা, নির্মাণ ব্যয়, পরিচালন ব্যয় এবং পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা হবে।
এ জন্য ডিটিসিএ ও বুয়েটের মধ্যে ‘কনসালট্যান্সি সার্ভিস ফর প্রি-ফিজিবিলিটি স্টাডি অব মনোরেল অ্যালাইনমেন্ট ইন্টিগ্রেশন উইথ মাস ট্রানজিট নেটওয়ার্কস ইন ঢাকা মেট্রোপলিটন রিজিয়ন’ শীর্ষক পরামর্শক চুক্তি হয়েছে। প্রাক্-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও দুটি রুটের বিস্তারিত নকশা তৈরির জন্য সরকারি রাজস্ব বাজেট থেকে ৭ কোটি ৫৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় সড়কের জায়গা সীমিত হওয়ায় উড়ালপথে চলাচলকারী মনোরেল একটি বিকল্প গণপরিবহন ব্যবস্থা হতে পারে। তবে এর নির্মাণ ব্যয়, যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা, পরিচালন ব্যয় এবং অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারের বৃহত্তর নগর পরিবহন উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত রুটগুলোর বিস্তারিত সমীক্ষা ও নকশা শেষ করে ২০৩০ সালের মধ্যে দুটি মনোরেল রুট নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

