‘কুফরি কালাম’ ও ‘কালো জাদু’ করার অভিযোগ তুলে একই পরিবারের তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে সড়কে ঘোরানোর অভিযোগ উঠেছে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের সদস্য জিয়াউর রহমান জিয়া ও তার ভাই ইয়ারুল ইসলামের বিরুদ্ধে। একই ঘটনায় ওই তিন নারীকে একটি কক্ষে আটকে রেখে ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোর করে স্বাক্ষর নেওয়ারও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিকেলে গুরুদাসপুর পৌরসভার গাড়িষাপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। পরে রাতে ঘটনার দুটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিন নারীর গলায় জুতার মালা পরিয়ে গ্রামের পাকা সড়ক দিয়ে ঘোরানো হচ্ছে। তাদের পেছনে কয়েকজনকে হাঁটতে দেখা যায়। এ সময় সেখানে হৈ-হুল্লোড়ও চলছিল।
অন্য একটি ভিডিওতে জিয়াউর রহমান জিয়ার বাড়ির একটি কক্ষে তিন নারীকে আটকে রাখা অবস্থায় দেখা যায়। সেখানে ‘ছাবলু’ নামে এক ব্যক্তি সংবাদকর্মীদের ক্যামেরার সামনেই ওই নারীদের কাছ থেকে ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিচ্ছেন। পাশে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করতে দেখা যায় জিয়াউর রহমান জিয়াকে।
‘কালো জাদু’র অভিযোগ
স্থানীয়দের ভাষ্য, জিয়াউর রহমান জিয়ার এক ভাতিজিকে ‘কুফরি কালাম’ ও ‘কালো জাদু’ করে ‘বান’ মারার অভিযোগ তোলা হয় ওই তিন নারীর বিরুদ্ধে। এরপর তাদের বাড়ি থেকে ধরে এনে জুতার মালা পরিয়ে সড়কে ঘোরানো হয়।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাদের জোর করে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে মারধর করেন ইয়ারুল ইসলাম। পরে ‘কালো জাদু’ করার অপবাদ দিয়ে প্রকাশ্যে অপমান করা হয়। আটকে রাখার পর ফাঁকা স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এ ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন তারা।
ইয়ারুলের পাল্টা অভিযোগ
তবে তিন নারীর বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ করেছেন ইয়ারুল ইসলাম। সোমবার সন্ধ্যায় তিনি তাদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন।
ইয়ারুলের দাবি, প্রায় ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন কবিরাজের মাধ্যমে ওই তিন নারী তার মেয়ের ওপর ‘কুফরি কালাম’ ও ‘বান’ করেছেন। এতে তার মেয়ের শারীরিক নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে।
তবে তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে প্রকাশ্যে ঘোরানোর অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইয়ারুল সরদার বলেন, তার মেয়ের সঙ্গে বিয়ের প্রস্তাব ভেঙে যাওয়ার পর থেকেই মেয়েটি অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ না হওয়ায় কবিরাজ ও মাওলানাদের মাধ্যমে ঝাড়ফুঁক করানো হয়। সেখান থেকেই মেয়েকে ‘কালো জাদু’ করার বিষয়টি জানতে পারেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে মহল্লার লোকজন ওই নারীদের ধরে এনে জুতার মালা পরিয়ে এলাকায় ঘোরান বলে জানান তিনি।
‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই’
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন গুরুদাসপুর উপজেলা যুবদলের সদস্য জিয়াউর রহমান জিয়া।
গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, “আমি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত নই। মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আমার হাত ভেঙে যাওয়ার পর থেকে আমি বিছানায় রয়েছি।”
অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা: পুলিশ
গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আবদুল হান্নান বলেন, তিন নারীকে জুতার মালা পরিয়ে সড়কে ঘোরানোর বিষয়ে থানায় এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।

