তিন জেলায় প্রাণহানি, গ্রামরক্ষী ও বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলা; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তৎপর প্রশাসন
ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় রাজ্যটির তিনটি জেলায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। সংঘর্ষের পাশাপাশি একাধিক বাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং বিভিন্ন স্থানে সশস্ত্র হামলার ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। নতুন করে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ায় রাজ্যটিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ছয়জন নাগা, দুজন কুকি এবং একজন নেপালি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি। কামজং ও কাংপোকপি জেলায় চারজন করে এবং উখরুল জেলায় একজন প্রাণ হারিয়েছেন। বিভিন্ন এলাকায় হামলা ও পাল্টা হামলার ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন।
এদিকে রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দিল্লিতে বৈঠক করেছেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই খেমচাঁদ সিং। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ও সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন তিনি। রাজ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
কামজংয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান ঘিরে উত্তেজনা
কামজং জেলায় শুক্রবার রাতে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর গোলাগুলির পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। এ ঘটনায় ৪২ বছর বয়সী কুকি নারী ডমখোনেই তৌথাং নিহত হন। পাঁচ সন্তানের জননী ওই নারী কীভাবে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন, তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
কর্মকর্তারা জানান, চাসাদ থানার কাছে অবৈধ বাংকার অপসারণের জন্য পুলিশ, ইন্ডিয়ান রিজার্ভ ব্যাটালিয়ন ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ যৌথ অভিযান চালাচ্ছিল। এ সময় একদল নারী অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের সঙ্গে কথা বলার মধ্যেই অজ্ঞাত হামলাকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। জবাবে পাল্টা গুলি চালায় বাহিনী।
কুকি নারী সংগঠন কুকি উইমেন ইউনিয়নের দাবি, একই ঘটনায় ২৩ বছর বয়সী মাইকেল এনগামমিনলেন হাওকিপ নামের এক যুবকও নিহত হয়েছেন। এক কর্মকর্তা তার মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এ ঘটনার পর দুই সম্প্রদায়ের সদস্যদের অন্তত ১৪টি বাড়িতে আগুন দেওয়ার খবর পাওয়া যায়। শনিবার সকালে সংঘর্ষের প্রাথমিক স্থান থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরের নিংচৌ চিংডং গ্রামে দুই নাগা গ্রামরক্ষী নিহত হন। তারা হলেন এনগাচানসো নিংশেন (৩০) ও লেইশিশান হুংয়ো (৫০)।
পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের ওপার থেকে আসা কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী এ হামলায় জড়িত থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার তদন্ত চলছে।
কাংপোকপিতে নাগা গ্রামরক্ষীদের ওপর হামলা
কামজংয়ের পাশাপাশি প্রতিবেশী কাংপোকপি জেলাতেও প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে। শনিবার ভোরে মাকুই গ্রামে হামলায় তিন নাগা গ্রামরক্ষী নিহত হন। তাদের নাম মাচুংগামামং, আজিনপৌ রিংকাংমাই ও রোবার্ট।
এর প্রায় এক ঘণ্টা পর তাপোন থেকে মাকুই গ্রামের দিকে যাওয়া নাগা স্বেচ্ছাসেবকদের ওপর হামলা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, গ্রামে হামলার খবর পেয়ে সহায়তা করতে যাওয়ার সময় সন্দেহভাজন কুকি সশস্ত্র ব্যক্তিরা তাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়।
এ ঘটনায় থালোন গ্রামের ৩৫ বছর বয়সী মাচুংওয়াংবৌ নিহত হন। আহত হন আরও দুজন। তাদের গুলিবিদ্ধ অবস্থায় সেনাপতি জেলার সদর দপ্তরে চিকিৎসার জন্য নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার প্রতিবেদন প্রকাশের সময়ও ওই এলাকায় গোলাগুলি চলছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা অব্যাহত ছিল।
এদিকে সহিংসতার প্রতিবাদ এবং বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবিতে কাংপোকপি জেলায় ২৪ ঘণ্টার সর্বাত্মক বন্ধের ডাক দিয়েছে কুকি সংগঠন কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি। এতে ওই এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
উখরুলে সড়কে হামলায় প্রাণ গেল চালকের
উখরুল জেলাতেও অজ্ঞাত সশস্ত্র হামলাকারীদের গুলিতে সন্দীপ রাই (৩০) নামের এক গাড়িচালক নিহত হয়েছেন। নেপালি বংশোদ্ভূত ওই ব্যক্তি শনিবার সকালে কনজাং গ্রামে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় হামলার শিকার হন।
পুলিশ জানিয়েছে, ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ইম্ফল থেকে উখরুল হয়ে নাগাল্যান্ডের দিকে যাওয়া জাতীয় মহাসড়ক-২০২-এ এ ঘটনা ঘটে। হামলার পেছনে কারা রয়েছে এবং কী উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে।
২০২৩ সাল থেকে সহিংসতায় বিপর্যস্ত মণিপুর
মণিপুরে জাতিগত সহিংসতার সূত্রপাত ২০২৩ সালের মে মাসে। শুরুতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই ও আদিবাসী কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়লেও পরবর্তী সময়ে অন্য সম্প্রদায়গুলোর মধ্যেও উত্তেজনা বাড়ে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ সহিংসতায় এ পর্যন্ত প্রায় ৩২০ জন নিহত এবং ৬৬ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নাগা সম্প্রদায় প্রথমদিকে সংঘাতের বাইরে থাকলেও চলতি বছরের ১৩ মে নোনে ও কাংপোকপি জেলায় দুটি অতর্কিত হামলার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। ওই হামলায় তিন গির্জার নেতাসহ চার বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। একই দিনে নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের ৪৮ জনকে জিম্মি করার খবর পাওয়া যায়।
পরবর্তী সময়ে কয়েক দফায় কিছু জিম্মিকে মুক্তি দেওয়া হলেও ছয় নাগার বিকৃত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় নতুন করে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে নাগা ও কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যেও উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
সর্বশেষ সংঘর্ষে তিন জেলায় প্রাণহানি ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মণিপুরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি আবারও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিনের জাতিগত বিরোধের মধ্যে নতুন করে একাধিক সম্প্রদায়ের সংঘাতে জড়িয়ে পড়া শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

