সরকারের কর্মকাণ্ডে নজরদারি বাড়ানো, মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রম মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিরোধী দলকে ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তাঁর মতে, ওয়েস্টমিনস্টার ধারার সংসদীয় গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট আয়োজিত শরৎ উৎসব ও নবীনবরণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এ আহ্বান জানান।
ডেপুটি স্পিকার বলেন, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠন করা হলে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কাজ আলাদাভাবে পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে। এতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর বিরোধী দলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধিরা নজর রাখতে পারবেন। পাশাপাশি সরকারের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার সুযোগ বাড়বে।
তিনি বলেন, সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরা এবং গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে কার্যক্রমের উন্নয়নে ভূমিকা রাখা বিরোধী দলের অন্যতম দায়িত্ব। শুধু রাজপথের আন্দোলনে সীমাবদ্ধ না থেকে সংসদেও বিরোধী দলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক মতভিন্নতা থাকলেও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমের ওপর কার্যকর নজরদারি প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন কায়সার কামাল। তিনি মনে করেন, সততা, নৈতিকতা ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে সংসদীয় গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হবে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ওপর গুরুত্ব
দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের সুফল জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামোগত পরিবর্তন জরুরি বলে মন্তব্য করেন ডেপুটি স্পিকার। তাঁর ভাষ্য, আমলাতন্ত্র, সিভিল প্রশাসন ও প্রকৌশল বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনতে হবে।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন সম্ভব হলেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে বিদ্যমান দুর্বলতা দূর করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অর্জন করা কঠিন হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া সরকারি খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও জনগণকে প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব নয়।
কায়সার কামালের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও জনবান্ধব, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে রাষ্ট্রীয় সেবার মান বাড়ার পাশাপাশি জনগণের কাছে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের সুফল পৌঁছানো সহজ হবে।
প্রশাসনিক জটিলতায় ব্যাহত হচ্ছে সরকারি উদ্যোগের সুফল
সরকারের বিভিন্ন প্রণোদনা ও সহায়তা কর্মসূচি বাস্তবায়নে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং লালফিতার দৌরাত্ম্য বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে বলেও উল্লেখ করেন ডেপুটি স্পিকার।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য সরকার নানা ধরনের উদ্যোগ ও সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু বাস্তবায়ন পর্যায়ে প্রশাসনিক জটিলতা ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় এসব উদ্যোগের সুফল যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায় না।
নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভালো উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কার্যকর না হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া কঠিন বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ কারণে সরকারি সেবা ও সহায়তা কার্যক্রমের বাস্তবায়নব্যবস্থা আরও গতিশীল এবং জনমুখী করার ওপর জোর দেন কায়সার কামাল।
সম্মিলিত উদ্যোগে কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ার আহ্বান
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসন ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্বারোপ করেন ডেপুটি স্পিকার।
তিনি মনে করেন, একটি কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের জবাবদিহিতা, বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণের পথ আরও সুগম হবে।
কায়সার কামালের বক্তব্যে সংসদে গঠনমূলক বিরোধী দলের ভূমিকা জোরদার করার পাশাপাশি প্রশাসনিক সংস্কার ও সরকারি সেবার মান উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তাঁর আহ্বান, রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থে সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

