জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলাম বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জ্বালানি খাতের সংকট মোকাবিলায় সরকার গত সাত মাসে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি। এ ব্যর্থতার দায় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও জ্বালানিমন্ত্রীকে অবিলম্বে পদত্যাগ করতে হবে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এনসিপির সপ্তাহব্যাপী লিফলেট বিতরণ ও গণসংযোগ কর্মসূচির উদ্বোধনী আয়োজনে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনশৃঙ্খলার অবনতি, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের প্রতিবাদে আগামী ৩০ অক্টোবর গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে এনসিপি। এ কর্মসূচির প্রচার ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে সপ্তাহব্যাপী গণসংযোগ শুরু করেছে দলটি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ অসহায় বোধ করছে। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এনসিপি তাদের পাশে থাকবে। তাঁর ভাষ্য, গণবিরোধী ও অগণতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া মানুষের অধিকার আদায় সম্ভব নয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা করে এনসিপি আহ্বায়ক বলেন, গত সাত মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে সংবিধান নিয়ে ব্যস্ত থেকে এমন পরিবর্তনের চেষ্টা চলছে, যা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ অবস্থায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নাহিদ ইসলাম।
জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, এ খাতে গত সাত মাসে সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। জ্বালানিমন্ত্রীও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেন তিনি। আপাতত এই দুই মন্ত্রীর পদত্যাগ এবং মন্ত্রিপরিষদ পুনর্গঠনের দাবি জানিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, যাঁরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হচ্ছেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে ঐক্যের আহ্বান
কারওয়ান বাজার থেকে গণসংযোগ শুরু করার কারণ ব্যাখ্যা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচাবাজার ও সবজির কেন্দ্র এই এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক মাস আগে ব্যবসায়ীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে চাঁদাবাজদের প্রতিহত করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সারা দেশে চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস, দখলদারত্ব ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান এনসিপি আহ্বায়ক। তাঁর মতে, এসব কর্মকাণ্ডের কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে।
৩০ অক্টোবর শাহবাগে গণবিক্ষোভ
নাহিদ ইসলাম জানান, চারটি প্রধান ইস্যু সামনে রেখে আগামী ৩০ অক্টোবর দুপুর ৩টায় ঢাকার শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে গণবিক্ষোভ করবে এনসিপি। ইস্যুগুলো হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ। ঢাকা মহানগর থেকে শুরু করে পর্যায়ক্রমে সারা দেশেও এ কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও তাঁদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়েও তিনি উদ্বেগ জানান। নেত্রকোনায় সাংবাদিক হত্যাকাণ্ড, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে সাংবাদিককে গুলি এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকদের ওপর হামলার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনভাবে তথ্য প্রকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের সমালোচনা করায় মানুষকে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের নামে আরও দমনমূলক আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলে তা সংসদে পাস হতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি। পাশাপাশি গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত কর্তৃত্ববাদী আইনগুলো বাতিলের দাবি জানান।
দ্রব্যমূল্য ও জ্বালানির দাম নিয়ে সমালোচনা
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, সাধারণ মানুষের পক্ষে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। কারওয়ান বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, উচ্চমূল্যের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোও খাদ্য ও নিত্যপণ্যের কেনাকাটা কমাতে বাধ্য হচ্ছে।
এলপিজি গ্যাসের দাম এবং অকটেনের মূল্যবৃদ্ধি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন তিনি। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে দেখানো হলেও সংকট মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর পরিকল্পনা নেই বলে অভিযোগ করেন এনসিপি আহ্বায়ক।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবি
এনসিপির দাবিগুলো তুলে ধরে নাহিদ ইসলাম বলেন, একদলীয় সংবিধান সংশোধন কমিটি ভেঙে দিয়ে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। সেই পরিষদের মাধ্যমে নতুন সংস্কারকৃত সংবিধান প্রণয়ন এবং জুলাই সনদে উল্লিখিত গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
এ ছাড়া জুলাই গণহত্যা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত নিশ্চিত করার আহ্বান জানান নাহিদ ইসলাম। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন এলাকায় জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ ও আহত ব্যক্তিদের পরিবারের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনারও বিচার দাবি করেন তিনি।
কমিটি পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য
এনসিপির পুনর্গঠিত কমিটি গঠনের বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, নির্বাচনের পর সংগঠনে নতুন সদস্য যুক্ত হওয়ায় সাংগঠনিক দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়া হবে।
সরকারপ্রধানের বক্তব্য ও রাজনৈতিক সমঝোতার প্রসঙ্গে বিএনপির সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ভোটব্যাংক নিজেদের দিকে টানার চেষ্টা করা হয়েছে। তাঁর দাবি, সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বিদ্যমান ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। ব্যক্তি বা সরকার বদলের পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থার পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দুর্গাপূজায় সম্প্রীতি রক্ষায় জনগণকে ধন্যবাদ
দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হওয়ায় দেশের শান্তিপ্রিয় জনগণকে ধন্যবাদ জানান নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য সাধারণ মানুষই রক্ষা করেছে। পূজার সময় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, বিরোধী দলের কর্মী এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা সহযোগিতা করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
একই সঙ্গে প্রতিবেশী দেশে সংখ্যালঘু ও মুসলমানদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ তুলে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে অপপ্রচার চালানোর সমালোচনা করেন এনসিপি আহ্বায়ক। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে সবাইকে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।

