আন্তর্জাতিক ডেস্ক:মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক বাধা ও আমদানি জটিলতার মধ্যেও ইরানের বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে সর্বশেষ মডেলের স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, গেমিং কনসোলসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্য। যুক্তরাষ্ট্রে বাজারে আসার কয়েক দিনের মধ্যেই তেহরানের দোকানগুলোতে বিক্রি শুরু হয়েছে অ্যাপলের আইফোন ১৮ সিরিজ। তবে পণ্য পাওয়া গেলেও উচ্চ আমদানি ব্যয়, সরকারি শুল্ক ও নিবন্ধন ফির কারণে এসব প্রযুক্তিপণ্য সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানে অ্যাপলের সরাসরি ব্যবসায়িক কার্যক্রম নেই। দীর্ঘদিনের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি আঞ্চলিক সংঘাত ও পরিবহনব্যবস্থার জটিলতায় দেশটিতে ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানি ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। এতে বৈধ আমদানির পাশাপাশি বিকল্প ও অনানুষ্ঠানিক পথে পণ্য আনার প্রবণতা বাড়ছে।
বদলে যাচ্ছে আমদানির পথ
তেহরানের বড় ইলেকট্রনিক পণ্যের বাজার চারসু মলের এক ব্যবসায়ী আলজাজিরাকে জানান, আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই হয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইলেকট্রনিক পণ্য ইরানে আসত। এখন আমদানির প্রক্রিয়া আগের তুলনায় অনেক বেশি জটিল, সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য ব্যাহত হয়েছে। গত ১৯ আগস্ট সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য, বাণিজ্যিক বিনিময় ও আর্থিক লেনদেন বন্ধের ঘোষণা দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে কিছু ব্যবসায়ী ওমান থেকে আসা যাত্রীদের মাধ্যমে ফোন আনার চেষ্টা করেন। সেপ্টেম্বরে ইরানের সব বিমান সংস্থার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর বিমান যোগাযোগও আরও সীমিত হয়ে পড়ে। ওই ব্যবসায়ীর দাবি, বর্তমানে অধিকাংশ ফোনই চোরাই পথে ইরানে ঢুকছে। কিছু পণ্য প্রথমে ইরাকে নেওয়া হয়, পরে স্থলপথে ইরানে প্রবেশ করানো হয়।
প্রযুক্তিপণ্যের দাম আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে বেশি
আমদানি ব্যয় ও সরবরাহের জটিলতার প্রভাব পড়েছে বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্যের দামে। আলজাজিরার প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তেহরানে চলতি সপ্তাহে অ্যাপলের ১৫ ইঞ্চি ম্যাকবুক এয়ার এম৪-এর দাম ছিল ১ হাজার ৪৫০ ডলারের বেশি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের গড় খুচরা দামের তুলনায় এটি প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।
অন্যদিকে, এক টেরাবাইট ধারণক্ষমতার প্লেস্টেশন ৫ স্লিমের ডিস্ক সংস্করণের দাম প্রায় ৭৩০ ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু দোকানের তুলনায় এ দাম প্রায় ১১ শতাংশ বেশি।
স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে বাড়তি ব্যয়ের চাপ আরও বেশি। ফলে সর্বশেষ প্রযুক্তির পণ্য বাজারে এলেও উচ্চমূল্যের কারণে সেগুলো কেনার সামর্থ্য সীমিতসংখ্যক ক্রেতার মধ্যেই আটকে থাকছে।
ফোনের দামের সঙ্গে বাড়ছে শুল্ক ও নিবন্ধন ব্যয়
ইরানে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে হলে আমদানি করা হ্যান্ডসেট নিবন্ধন করাতে হয়। সরকার নির্ধারিত নিবন্ধন ফি পরিশোধ না করলে ৩০ দিন পর ফোনে মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা যায় না। চোরাচালান ও দুর্নীতি ঠেকানোর উদ্দেশ্যে প্রায় এক দশক আগে এ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল।
ফোনের মূল্যের ওপর নির্ভর করে আমদানি শুল্ক সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর সঙ্গে অন্যান্য সরকারি ফি এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ওয়ারেন্টি বাবদ খরচ যুক্ত হয়। ফলে কোনো কোনো ফোনের ক্ষেত্রে মূল দামের অতিরিক্ত ব্যয় ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক বাজারে একটি ফোনের যে দাম, ইরানে সেটি কিনতে ক্রেতাকে তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। বৈধ পথে আমদানি ও নিবন্ধনের খরচ বেশি হওয়ায় অনানুষ্ঠানিক বাজারের ওপরও চাপ তৈরি হচ্ছে।
বিধিনিষেধের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা
ফোন কিনে নিবন্ধন করালেও ইরানের ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেট ব্যবহারে নানা বিধিনিষেধের মুখে পড়েন। দেশটির সরকার অনলাইনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। অন্যদিকে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেন এবং বিভিন্ন বিদেশি ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের সুযোগও সীমিত।
ফলে প্রযুক্তিপণ্য আমদানি করে বাজারে বিক্রি করাই শেষ বাধা নয়; এসব পণ্যের মাধ্যমে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সেবা ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বছরে ১৬০ কোটি ডলারের ফোন আমদানি
ইরানের রাষ্ট্রসংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে শেষ হওয়া অর্থবছরে দেশটিতে বাণিজ্যিকভাবে প্রায় ১৬০ কোটি ডলারের মোবাইল ফোন আমদানি করা হয়েছে। এসব ফোনের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশের দাম ছিল ৬০০ ডলারের বেশি।
এ ছাড়া বিমানে আসা যাত্রীরা প্রায় ৪৭ কোটি ডলারের মোবাইল ফোন এনেছেন, যার বেশির ভাগই উন্নত মডেলের। তবে চোরাই পথে আসা ফোনের প্রকৃত পরিমাণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই।
ইরানের বাজারে সর্বশেষ প্রযুক্তিপণ্যের উপস্থিতি দেখাচ্ছে, নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্যিক বাধা সত্ত্বেও এসব পণ্যের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমদানি ও পরিবহনের জটিলতা, বাড়তি শুল্ক এবং নিবন্ধন ব্যয় প্রযুক্তিপণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে বাজারে পণ্য থাকলেও তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকছে না।
সূত্র: আলজাজিরা

