নিজস্ব প্রতিবেদক: জাপানের বেসরকারি খাত থেকে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ১ লাখ কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশে প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে প্রায় ৩২ কোটি ডলারের জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়েও জাপানের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে বৈঠককে অত্যন্ত ফলপ্রসূ হিসেবে উল্লেখ করে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব তথ্য জানানো হয়।
পোস্টে তারেক রহমান বলেন, জাপান সফর বাংলাদেশ ও জাপানের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। বৈঠকে দুই দেশের নেতারা গণতন্ত্র, আইনের শাসন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তিপূর্ণ, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় অভিন্ন অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী জানান, দুই দেশের আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান অংশীদারত্বকে বাংলাদেশের মানুষের জন্য বাস্তব ও দৃশ্যমান সুযোগে রূপ দেওয়া। আগামী পাঁচ বছরে জাপানের বেসরকারি খাতের সম্ভাব্য বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশের শিল্পায়ন, উৎপাদন সক্ষমতা ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জ্বালানি খাতের বিষয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে জাপানের ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ৫ হাজার কোটি জাপানি ইয়েন বা প্রায় ৩২ কোটি মার্কিন ডলারের জরুরি আর্থিক সহায়তার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বিনিয়োগ ও সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের পাশাপাশি তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তবায়ন, বিনিয়োগের খাত ও সময়সীমা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রযুক্তি ও পরিবহন অবকাঠামোয় সহযোগিতার প্রস্তাব
আধুনিক প্রযুক্তি খাতে বাংলাদেশের সক্ষমতা বাড়াতে একটি বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছেন তারেক রহমান। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস, ইলেকট্রনিকস উৎপাদন এবং উন্নত প্রযুক্তিকে এ সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
এ ছাড়া মহাকাশবিজ্ঞান ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে যৌথ সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরের মধ্যে উচ্চগতির রেল যোগাযোগ স্থাপন এবং আধুনিক পরিবহন অবকাঠামো উন্নয়নেও জাপানের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ।
প্রধানমন্ত্রীর মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং দেশের যোগাযোগব্যবস্থার আধুনিকায়নে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হতে পারে।
বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্প উন্নয়নে যৌথ উদ্যোগ
বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় উদ্যোগকে যৌথ সমৃদ্ধির কাঠামোয় এগিয়ে নেওয়া। এ উদ্যোগের আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প অবকাঠামো, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়েছে বলে জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে সংযোগসেতু হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে এ উদ্যোগ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির দ্রুত বাস্তবায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জোরদার এবং দুই দেশের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলোকে কার্যকর উদ্যোগে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাপানের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ
রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য জাপানের অব্যাহত মানবিক সহায়তার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে, মর্যাদার সঙ্গে এবং টেকসইভাবে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাপানের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দিকের দেশগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। স্বাধীনতার পর থেকে দেশের উন্নয়নযাত্রার বিভিন্ন পর্যায়ে জাপান বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পাশে থেকেছে।
দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগের মাধ্যমে এ সম্পর্ক আরও জোরদার করেন।
নতুন অর্থনৈতিক যাত্রায় জাপানকে পাশে চায় বাংলাদেশ
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পর বাংলাদেশ নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। তাঁর সরকার বিনিয়োগ, উদ্ভাবন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থবহ কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী, সরকার ও জনগণের আতিথেয়তা এবং বাংলাদেশের প্রতি আস্থার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তারেক রহমান দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
তবে বৈঠকে আলোচিত বিনিয়োগ, আর্থিক সহায়তা, টেক পার্ক ও উচ্চগতির রেল প্রকল্পের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরবর্তী আলোচনা, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট চুক্তির অগ্রগতি গুরুত্বপূর্ণ হবে। প্রস্তাবগুলো কার্যকর উদ্যোগে রূপ নিলে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব নতুন মাত্রা পেতে পারে।

