বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলেও বাড়তি আয়ের সিংহভাগ আসছে প্রচলিত মৌলিক পোশাক থেকে। তুলনামূলক উচ্চমূল্যের পোশাকের রপ্তানি বাড়ছে ধীরগতিতে। আবার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রপ্তানি কমে যাওয়ায় মোট রপ্তানিতে উচ্চমূল্যের পোশাকের অংশও হ্রাস পেয়েছে। এতে রপ্তানি আয় বাড়লেও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো ও উচ্চমূল্যের বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে অগ্রগতির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের (বিএভি) প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মহিউদ্দিন রুবেলের সংকলিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র উঠে এসেছে।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ১ হাজার ৫৮ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৯৯৭ কোটি ডলার। সে হিসাবে এক বছরে রপ্তানি বেড়েছে ৬ দশমিক ১০ শতাংশ বা ৬০ কোটি ৮০ লাখ ডলার।
তবে এই প্রবৃদ্ধির প্রায় ৯৪ শতাংশ এসেছে মৌলিক পোশাক থেকে। এ শ্রেণির পণ্যে রপ্তানি বেড়েছে ৫৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে মৌলিক পোশাক রপ্তানি ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে ৮২৬ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। মোট পোশাক রপ্তানিতে এ ধরনের পণ্যের অংশও বেড়েছে। গত অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই অংশ ছিল ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ, চলতি অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৭৮ দশমিক ০৬ শতাংশে।
প্রবৃদ্ধির বড় ভরসা প্যান্ট, সোয়েটার ও টি-শার্ট
মৌলিক পোশাকের মধ্যে ট্রাউজার বা প্যান্ট, সোয়েটার ও কার্ডিগান এবং টি-শার্ট ও ভেস্ট রপ্তানি বৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। এই তিন পণ্যের রপ্তানি বেড়েছে যথাক্রমে ২০ কোটি ১০ লাখ, ১৭ কোটি ৮০ লাখ ও ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলার। সব মিলিয়ে মোট পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির প্রায় ৮০ শতাংশ এসেছে এই তিন পণ্য থেকে।
শিশুদের পোশাকের রপ্তানি বৃদ্ধির হার ছিল তুলনামূলক বেশি—১০ দশমিক ১৯ শতাংশ। তবে এ খাতে মোট রপ্তানির পরিমাণ ৩০ কোটি ডলার, যা সামগ্রিক রপ্তানিতে সীমিত অবদান রাখছে।
আধা মৌলিক পোশাকে প্রবৃদ্ধি সামান্য
শার্ট ও ব্লাউজের মতো আধা মৌলিক পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৭৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এ শ্রেণির পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৮৪ কোটি ২০ লাখ ডলারের। প্রবৃদ্ধি সামান্য হওয়ায় মোট পোশাক রপ্তানিতে এই শ্রেণির অংশও কমেছে। আগের বছরের ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ থেকে তা নেমে এসেছে ৭ দশমিক ৯৬ শতাংশে।
উচ্চমূল্যের পোশাকে গতি কম, কয়েকটি পণ্যে পতন
উচ্চমূল্যের পোশাকের রপ্তানি পরিস্থিতি আরও দুর্বল। উন্নত শ্রেণির পণ্যে রপ্তানি বেড়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ খাতে রপ্তানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪৮ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মাত্র ২ কোটি ১০ লাখ ডলার বেশি।
কোট, জ্যাকেট, ব্লেজার ও ওভারকোটের মতো আউটারওয়্যারের রপ্তানি বেড়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার। কারিগরি পোশাকের রপ্তানি বেড়েছে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার। বিপরীতে কয়েকটি পণ্যে উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে। গাউনজাতীয় পোশাকের রপ্তানি কমেছে ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। স্পোর্টসওয়্যার ও অ্যাকটিভওয়্যারে কমেছে ১১ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং স্যুট ও এনসেম্বলের রপ্তানি কমেছে ১৪ দশমিক ৪৮ শতাংশ।
এর প্রভাব পড়েছে মোট রপ্তানিতে উন্নত শ্রেণির পোশাকের অংশে। আগের অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে এই অংশ ছিল ১৪ দশমিক ৬৩ শতাংশ, চলতি অর্থবছরে তা কমে হয়েছে ১৩ দশমিক ৯৮ শতাংশ।
পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ
রপ্তানির সামগ্রিক পরিমাণ বাড়লেও প্রবৃদ্ধি কয়েকটি প্রচলিত পণ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। মৌলিক পোশাকের রপ্তানি বাড়ায় তাৎক্ষণিকভাবে আয় বাড়ছে, কিন্তু উচ্চমূল্যের পোশাক ও নতুন পণ্যের রপ্তানি একই গতিতে না বাড়ায় পণ্যভিত্তিক বৈচিত্র্য সীমিত থাকছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, রপ্তানি প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চমূল্যের পোশাকের বাজার সম্প্রসারণ এবং কমতে থাকা পণ্যগুলোর রপ্তানি পুনরুদ্ধার বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি আয় বাড়াতে প্রচলিত পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে উন্নত ও বৈচিত্র্যময় পোশাকের রপ্তানি বাড়ানো প্রয়োজন হবে।

