আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলগুলো রেকর্ড ১৮টি আসন পেতে পারে বলে বুথফেরত জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে দেশটির ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটদানের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে আরব দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট এবং বিরোধী জোট—দুই পক্ষই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে বলে জরিপে আভাস মিলেছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১২০ আসনের নেসেটে আরব নেতৃত্বাধীন প্রধান দুই রাজনৈতিক দল জয়েন্ট লিস্ট ও রা’আম মিলিয়ে ১৮টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট উভয়ই ৫১টি করে আসন পেতে পারে বলে বুথফেরত জরিপে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ইসরায়েলে সরকার গঠনের জন্য নেসেটে অন্তত ৬১ জন সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। সেই হিসাবে কোনো জোটই এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে না পারলে সরকার গঠনে আরব দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে এই হিসাবকে সম্ভাব্য চিত্র হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।
ভোটকেন্দ্রে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ব্যাপক উপস্থিতি
নির্বাচনে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের অংশগ্রহণ ছিল অন্যতম আলোচিত বিষয়। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, আরব নাগরিকদের মধ্যে ভোটদানের হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, সামগ্রিক ভোটার উপস্থিতি ছিল ৭৭ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ১৯৯৯ সালের পর সর্বোচ্চ।
প্রায় এক কোটি জনসংখ্যার ইসরায়েলে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ। ঐতিহাসিকভাবে ইহুদি ইসরায়েলিদের তুলনায় তাঁদের ভোটদানের হার কম ছিল। এবারের নির্বাচনে তাঁদের ব্যাপক অংশগ্রহণ আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আসন বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লা থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক নূর ওদেহ বলেন, এবারের নির্বাচন ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলিদের জন্য অস্তিত্বের সংকটময় মুহূর্ত। তাঁর মতে, নির্বাচনে ব্যাপক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিনি নাগরিকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভোটারগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তাঁদের মধ্যে এমন অনেকে রয়েছেন, যাঁরা অতীতে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে নিজেদের পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব বলে মনে করতেন না।
নূর ওদেহ আরও বলেন, ইসরায়েলের নেসেটে ফিলিস্তিনি নাগরিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক শতাধিক আইন পাস হয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি অর্থ বরাদ্দ ও রাষ্ট্রীয় তহবিল পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁরা বৈষম্যের শিকার হন বলে দাবি করেন তিনি।
সরকার গঠনে রা’আমের ভূমিকা
আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর মধ্যে রা’আমের অবস্থান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দলটির নেতা মানসুর আব্বাস আশা প্রকাশ করেছেন, চূড়ান্ত ফলাফলে তাঁর দলসহ নেতানিয়াহুবিরোধী পক্ষ ৬১টি আসনের সমর্থন পেতে পারে। তবে বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সমর্থন নিশ্চিত করা কঠিন।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে আব্বাস বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের হাতে যে সংখ্যাগুলো রয়েছে, তা দিয়ে সরকার গঠন সম্ভব নয়।’
বর্তমানে নেসেটে রা’আমের পাঁচটি আসন রয়েছে। ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলে ক্ষমতায় থাকা জোট সরকারের অংশ ছিল দলটি। আব্বাসের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগে ও পরে দেশটির প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটই তাঁর দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে।
এ থেকে বোঝা যায়, আরব দলগুলোকে সরকার গঠনের আলোচনার বাইরে রাখা কঠিন হতে পারে। তবে তাদের সমর্থন পেতে হলে সম্ভাব্য জোটগুলোকে নীতিগত ও রাজনৈতিক কিছু শর্তের মুখোমুখি হতে হবে।
আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট নিয়ে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব
ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত অ্যালন পিঙ্কাস আল জাজিরাকে বলেন, গাদি আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী পক্ষের জন্য সরকার গঠন সহজ হবে না। নির্বাচনী প্রচারণার সময় বিরোধী দলগুলোর নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের সমর্থন প্রয়োজন হলে সেই অবস্থান রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
পিঙ্কাসের মতে, আরব দলগুলোকে সরকার গঠনের বাইরে রেখে পরে শুধু ভোটের প্রয়োজনে তাদের কাছে যাওয়ার রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। একই সঙ্গে আরব দলগুলো সরকারে অংশ নেওয়ার বিনিময়ে যেসব দাবি তুলতে পারে, সেগুলো ইহুদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে।
ফলে নির্বাচনের ফলাফলে আসনসংখ্যার পাশাপাশি জোট গঠনের প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোন দল কার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে, তার ওপরই শেষ পর্যন্ত সরকার গঠনের সম্ভাবনা নির্ভর করতে পারে।
ভোটার উপস্থিতি নিয়ে নেতানিয়াহুর প্রচার
নির্বাচনের দিন নেতানিয়াহু ও তাঁর কট্টর ডানপন্থী মিত্ররা সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান। এ সময় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের ভোটার উপস্থিতি বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি প্রচারণায় গুরুত্ব পায়। আরব রাজনীতিকেরা এ ধরনের প্রচারকে বর্ণবাদী ও উসকানিমূলক বলে সমালোচনা করেন।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে আল জাজিরা জানায়, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টির পতাকাবাহী কয়েকটি গাড়ি জেরুজালেমের বিভিন্ন সড়কে ঘুরেছে। গাড়িগুলোতে উচ্চ শব্দে আজান বাজানোর পাশাপাশি সমর্থকদের ভোট দিতে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। প্রচারণায় বলা হচ্ছিল, ‘আরবরা ভোট দিচ্ছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতানিয়াহু আরব অধ্যুষিত এলাকার ভোটকেন্দ্রে দীর্ঘ সারির ছবিও প্রকাশ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, সমর্থকেরা সক্রিয় না হলে দেশটি মানসুর আব্বাস ও আহমাদ তিবির নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে চলে যেতে পারে।
নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য নির্বাচনে আরব নাগরিকদের ভোট এবং তাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে আসে।
চূড়ান্ত ফলের দিকে নজর
বুথফেরত জরিপের হিসাব সঠিক হলে এবারের নির্বাচনে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য ১৮টি আসন ইসরায়েলের সরকার গঠনের সমীকরণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। নেতানিয়াহুর জোট ও বিরোধী জোট—দুই পক্ষই ৫১টি করে আসন পেলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য তাদের অতিরিক্ত সমর্থন প্রয়োজন হবে।
এ অবস্থায় আরব দলগুলোকে ঘিরে রাজনৈতিক দর-কষাকষি বাড়তে পারে। তবে তারা কোন পক্ষকে সমর্থন করবে, কী শর্ত দেবে এবং শেষ পর্যন্ত কোন জোট সরকার গঠনে সক্ষম হবে—তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত ফলাফল ও পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনার ওপর।

