মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার কারণে তাদের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তার মতে, আর্থিক সুবিধা কিংবা ভাতা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃত সম্মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। বরং মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান ও ভূমিকাকে যথাযথ স্বীকৃতি দেওয়াই হবে প্রকৃত সম্মান।
শনিবার (৭ নভেম্বর) সিরাজগঞ্জ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যে টুকু অভিযোগ করেন, অতীতে মুক্তিযুদ্ধকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে চাকরিসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধের পরিচয়কে কাজে লাগানোর ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কমেছে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। তাদের আত্মত্যাগ ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলের কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, তিনি অল্প সময় রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থেকেও দেশের ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তার বিশেষ শ্রদ্ধা ছিল। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করেন টুকু।
১৯৭৫-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে আইনের শাসন ও সুশাসনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিয়েছিল। বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বহুদলীয় রাজনীতি ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়েছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বাধাগ্রস্ত হলে একসময় রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটে। ২০২৪ সালেও একই ধরনের পরিস্থিতির প্রতিফলন দেখা গেছে।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে টুকু বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে এবং সেনাবাহিনীর ভেতরে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ ও রাজনৈতিক বিভাজন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মুক্তিযুদ্ধে জিয়াউর রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি অন্যতম দক্ষ সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে সেনাবাহিনী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা তৈরি হয়েছিল।
৭ নভেম্বরকে সিপাহী হত্যা দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করার সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, ওই দিনের ঘটনাকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করা হয়। সেদিন সেনাসদস্যদের বিদ্রোহ এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন। তার মতে, ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক পরিস্থিতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারত।
জেলা প্রশাসক মো. আমিনুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু, জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. সাইফুল ইসলাম শাহীন, সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহীদুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাইদুর রহমান বাচ্চু এবং মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান দুলাল।
আলোচনা সভায় বক্তারা জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় মুক্তিযোদ্ধাদের অবদানের বিষয় তুলে ধরেন।

