spot_imgspot_img
spot_imgspot_img

১ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ, চট্টগ্রামে কৃষিতে নতুন লক্ষ্যমাত্রা

মো.মোক্তার হোসেন বাবু
spot_img

মো.মোক্তার হোসেন বাবু : চট্টগ্রামে বন্যার ধকল কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন হাজার হাজার কৃষক। কয়েক সপ্তাহ আগেও যে মাঠগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে ছিল, এখন সেসব জমিতে চলছে আমনের চারা রোপণের ব্যস্ততা। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমি প্রস্তুত, বীজতলা থেকে চারা উত্তোলন ও রোপণে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকরা। কোথাও এককভাবে, কোথাও আবার দলবদ্ধভাবে চলছে আমন রোপণের কাজ। এতে জেলার গ্রামীণ জনপদে ফিরে এসেছে কর্মচাঞ্চল্য, বিস্তীর্ণ কৃষিজমি ধীরে ধীরে সবুজে ভরে উঠছে।

- Advertisement -

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ১৫টি উপজেলায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ৯৮০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের আবাদ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৭ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আরও জমিতে চারা রোপণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত আমন আবাদের সময় থাকায় এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আপ্রু মারমা বলেন, বন্যার কারণে আমন রোপণে শুরুতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তবে বর্তমানে আবহাওয়া অনুকূলে রয়েছে এবং নিচু জমিগুলো থেকেও পানি কমে আসছে। আগামী দুই সপ্তাহে আমন আবাদের গতি আরও বাড়বে। অতিরিক্ত বীজতলা তৈরি হওয়ায় এবার লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কোনো সমস্যা হবে না বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

কৃষি বিভাগ জানায়, গত ৬ থেকে ১২ জুলাই টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামে ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হয়। জেলার দক্ষিণাঞ্চলের পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যার পানিতে কৃষকের ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে জেলার ১ লাখ ২৬ হাজার ৫১১ কৃষক পরিবারের প্রায় ২২২ কোটি ৬৫ লাখ টাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বন্যায় ১৬ হাজার ১৩২ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে ৫ হাজার ৯০৭ হেক্টর সবজি, ৯ হাজার ১১৮ হেক্টর আউশ ধান, ৯৬০ দশমিক ৬৬ হেক্টর আমন বীজতলা, ৭৮ হেক্টর পান, ৪০ হেক্টর আদা এবং ২৮ হেক্টর হলুদ ছিল। এ ছাড়া ২ হাজার ৬৮৩ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসল আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যায় আমনের বীজতলা ও চারা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় শুরুতে অনেক কৃষক আমন আবাদ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছিলেন।

তবে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে নতুন করে আমন আবাদে প্রয়োজনীয় বীজ ও সহায়তা দেওয়ায় তারা আবারও মাঠে ফিরেছেন। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ৩৩ হাজার ৬৯৬ কৃষকের মধ্যে ১৬৮ দশমিক ৪৮ মেট্রিক টন উন্নতমানের আমন বীজ বিতরণ করা হয়েছে। ফলে বীজ ও চারার ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে আমনের বীজতলার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ হাজার ২১১ হেক্টর। এর বিপরীতে ১০ হাজার ৭৩১ হেক্টর জমিতে বীজতলা তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১ হাজার ৫২০ হেক্টর বেশি জমিতে বীজতলা তৈরি হয়েছে। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, অতিরিক্ত বীজতলার কারণে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নতুন করে চারা সংগ্রহে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হয়নি। এতে আমন আবাদের গতি ফিরেছে।

সরেজমিনে পটিয়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী ও সাতকানিয়ার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকদের মধ্যে আমন রোপণ নিয়ে ব্যাপক ব্যস্ততা। কোথাও জমিতে ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার দিয়ে চাষ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কৃষকরা গরু দিয়ে জমি চাষ করছেন। জমি প্রস্তুত হওয়ার পর কৃষকরা বীজতলা থেকে চারা তুলে এনে সারিবদ্ধভাবে জমিতে রোপণ করছেন। বড় কৃষকরা শ্রমিক নিয়োগ করে দ্রুত চারা রোপণের কাজ শেষ করছেন।

পটিয়ার শান্তিরহাট ও কেলিশহর এলাকায় দেখা যায়, কৃষকরা জমির আইলে বসেই দুপুরের খাবার সারছেন। কেলিশহরের কৃষক আবদুল জব্বার বলেন, প্রতিবছর শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে আমনের চারা রোপণ শুরু করেন তারা। এবার বন্যার কারণে কিছুটা দেরি হলেও বর্তমানে আবহাওয়া ভালো থাকায় দ্রুত জমিতে চারা রোপণ করা যাচ্ছে। তার মতো অনেক কৃষকই বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে এবার ভালো ফলনের আশায় মাঠে নেমেছেন।

চন্দনাইশের শফিকুল আলম বলেন, বন্যার পানিতে তাদের বীজতলা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। পরে সরকারি সহায়তায় পাওয়া বীজ ও চারা দিয়ে আবার বীজতলা তৈরি এবং আমন রোপণ শুরু করেছেন তারা। বন্যার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ভালো ফলনের দিকে তাকিয়ে আছেন কৃষকরা।

উত্তর চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার গুমাইবিলেও চলছে আমন রোপণের উৎসব। দেশের অন্যতম বৃহৎ শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত এ বিলে ইতোমধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ জমিতে আমন রোপণ শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি কর্মকর্তারা। বন্যার সময় কয়েকদিন বিলটি পানির নিচে থাকায় অনেক কৃষকের বীজতলা নষ্ট হয়েছিল। পরে সরকারি সহায়তায় বীজ ও চারা পাওয়ায় দ্রুত তারা জমিতে ফিরতে পেরেছেন।

গুমাইবিলের কৃষক আজিজার ভুঁইয়া বলেন, বন্যার পানিতে বীজতলা নষ্ট হয়ে গেলেও পরে সরকারি অফিস থেকে বীজ ও চারা পাওয়ায় দ্রুত আমন রোপণ করা সম্ভব হয়েছে। তার ১০ কানি জমিতে ইতোমধ্যে আমন রোপণ শেষ হয়েছে। আগামী সপ্তাহে জমিতে সার প্রয়োগ করবেন বলেও জানান তিনি।

এদিকে আমন মৌসুমে সারের সরবরাহ নিয়েও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে কৃষি বিভাগ ও প্রশাসন। কৃষি বিভাগ বলছে, চট্টগ্রামে বর্তমানে চাহিদা অনুযায়ী পর্যাপ্ত সারের মজুত রয়েছে। ফলে আমন মৌসুমে সার নিয়ে সংকট তৈরির আশঙ্কা নেই। বাজারে সারের সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিও নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আপ্রু মারমা বলেন, সার নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কৃষকদের যেন অতিরিক্ত দামে সার কিনতে না হয়, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে। আমন মৌসুমে সার নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।

spot_imgspot_img
spot_imgspot_img

সর্বশেষ