বিশেষ প্রতিবেদক : বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৮৪ কোটি মার্কিন ডলার। এই বাণিজ্য আরও বাড়ানোর পাশাপাশি পণ্য ও সেবা খাতে প্রবেশাধিকার সহজ করতে ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দুই দেশ।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী প্রথম দফার আলোচনা শুরু হয়। উদ্বোধন করেন বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। আলোচনার কাঠামো ও কার্যপরিধি নির্ধারণে দুই দেশের প্রতিনিধিরা ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) স্বাক্ষর করেন। প্রথম দফার আলোচনা চলবে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত।
মালয়েশিয়ার ৩১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির প্রধান আলোচক ড. রশিদি সাইদ। বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দিচ্ছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও প্রধান আলোচক খাদিজা নাজনীন।
শুধু শুল্ক কমানো নয়, বাণিজ্য বহুমুখীকরণেও গুরুত্ব
বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আশাব্যঞ্জক হলেও বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বহুমুখীকরণের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এ ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা ধরে রাখা আরও গুরুত্বপূর্ণ হবে। নতুন বাজারে প্রবেশ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক বাধা কমাতে এফটিএ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রস্তাবিত চুক্তিতে শুল্ক ছাড়ের পাশাপাশি পণ্য ও সেবা বাণিজ্য, পণ্যের উৎপত্তিবিধি এবং শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এসব বিষয়ে দুই দেশের বাণিজ্যিক স্বার্থ সুরক্ষিত রেখে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
হালাল শিল্প থেকে সেমিকন্ডাক্টর, বিনিয়োগে নতুন সম্ভাবনা
চুক্তির আওতায় সম্ভাবনাময় কয়েকটি খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে হালাল শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল বাণিজ্য, লজিস্টিকস এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যৌথ বিনিয়োগ।
এসব খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ করা গেলে প্রচলিত পণ্য বাণিজ্যের বাইরে প্রযুক্তি, উৎপাদন ও সেবাভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্পর্কও জোরদার হতে পারে। একই সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রধান আলোচক ড. রশিদি সাইদ বলেন, প্রস্তাবিত চুক্তির উদ্দেশ্য শুধু শুল্ক কমানো নয়; বরং দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব গড়ে তোলা। পারস্পরিক সমঝোতা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার ভিত্তিতে ২০২৭ সালের মধ্যে আলোচনা শেষ করার বিষয়ে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশের প্রধান আলোচক খাদিজা নাজনীন বলেন, চুক্তি কার্যকর হলে দুই দেশের বাজারে প্রবেশ সহজ হবে, বাণিজ্যিক বাধা কমবে এবং বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া এফটিএ আলোচনার গুরুত্ব রয়েছে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও। চুক্তিতে বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যগুলোর জন্য কার্যকর শুল্কসুবিধা নিশ্চিত করা গেলে মালয়েশিয়ার বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ বাড়তে পারে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা দেশের উৎপাদন খাতের সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে এসব সুফল নিশ্চিত করতে চুক্তির শর্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। কোন পণ্যে কতটা শুল্ক ছাড় দেওয়া হবে, কোন সেবা খাতে বাজারে প্রবেশের সুযোগ মিলবে এবং পণ্যের উৎপত্তিবিধি কীভাবে নির্ধারিত হবে—এসব বিষয় চূড়ান্ত সমঝোতায় নির্ধারিত হবে।
একই সঙ্গে আমদানি বাড়ার সম্ভাব্য প্রভাব, দেশীয় শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
প্রথম দফার আলোচনায় উভয় পক্ষ গঠনমূলক সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নমনীয়তার ভিত্তিতে কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি প্রণয়নের অঙ্গীকার করেছে। এখন আলোচনার পরবর্তী ধাপগুলোতে বাণিজ্যিক স্বার্থের সমন্বয় এবং বাস্তবায়নযোগ্য শর্ত নির্ধারণের ওপর নির্ভর করবে ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য কতটা এগিয়ে যায়।

