নিজস্ব প্রতিবেদক : জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের নগরাঞ্চলে শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। তীব্র গরমে পানিশূন্যতা ও তাপজনিত অসুস্থতা, জলাবদ্ধতা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে মশাবাহিত রোগ এবং অনিরাপদ পানির কারণে চর্ম ও পানিবাহিত রোগের আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশুরা এসব ঝুঁকিতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। ঢাকা, রাজশাহী ও সাতক্ষীরার নিম্ন আয়ের মানুষের বসতি এলাকায় পরিচালিত এক মাঠ জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, অংশগ্রহণকারী পরিবারগুলোর ৬৯ শতাংশ ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া ১৮ শতাংশ পরিবার চর্মরোগ, ১০ শতাংশ পানিবাহিত রোগ এবং ৩ দশমিক ৫ শতাংশ শ্বাসতন্ত্রের রোগের কথা জানিয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার ভবনে ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে নগরের শিশুস্বাস্থ্য: সংকট ও সমস্যা সমাধানে করণীয়’ শীর্ষক উপস্থাপনা ও নাগরিক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। চিলড্রেন ওয়াচ ফাউন্ডেশন আয়োজিত অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এনভায়রনমেন্টাল ইনোভেশন অ্যান্ড রিসার্চ নেটওয়ার্কের (ইআইআরএন) প্রধান নির্বাহী শাহ ইসরাত আজমেরী।
তাপপ্রবাহ সবচেয়ে বড় উদ্বেগ
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর ৫১ দশমিক ৮৭ শতাংশ তাপপ্রবাহকে জলবায়ুজনিত চাপের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অনুভূত সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেছে। এ ছাড়া ৩০ দশমিক ৪৮ শতাংশ পরিবার জলাবদ্ধতা, ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ নদীভাঙন এবং শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ পরিবার লবণাক্ততার কথা জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তীব্র গরম শিশুদের শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা তৈরি করতে পারে। দীর্ঘ সময় গরম পরিবেশে থাকা শিশুদের তাপজনিত অসুস্থতার ঝুঁকিও বাড়ে। অন্যদিকে জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মশার বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। দূষিত পানি ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের কারণে বাড়তে পারে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি।
জরিপটি পরিচালিত হয়েছে ঢাকা মহানগরের মিরপুর ৬, হাজারীবাগ, বৌবাজার, বড়াইখালী ও বোটঘাট বস্তি; রাজশাহী নগরের নমোভদ্র ও বুধপাড়া বস্তি এবং সাতক্ষীরা পৌরসভার রহমতপুর ও বদ্দিপুর কলোনিতে।
নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনে ঘাটতি
জরিপে নগরের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থার দুর্বলতাও উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার ভাগাভাগি করে শৌচাগার ব্যবহার করে। মাত্র ৫৫ শতাংশ পরিবার পানীয় জলের উৎস হিসেবে নলকূপের পানি ব্যবহারের কথা জানিয়েছে।
ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব শিশুদের রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে পরিবেশ দূষণ ও রোগজীবাণুর বিস্তারের আশঙ্কা তৈরি হয়।
জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, অংশগ্রহণকারী পরিবারের ৭০ দশমিক ৫৯ শতাংশ তিনবারের বেশি জলবায়ুজনিত দুর্যোগের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছে। ১৯ শতাংশ পরিবার দুই থেকে তিনবার এবং ৮ শতাংশ পরিবার একবার এমন দুর্যোগের মুখোমুখি হয়েছে। মাত্র ৩ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, তারা এ ধরনের দুর্যোগের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়নি।
২০২৫ সালে পরিচালিত এই জরিপে ৫৪ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিস্থিতিতে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্য ও বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা
জলবায়ুজনিত ঝুঁকি শিশুদের শুধু তাৎক্ষণিক অসুস্থতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখে না। বারবার সংক্রমণ, পানিশূন্যতা ও অপুষ্টির আশঙ্কা তাদের স্বাভাবিক শারীরিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে। অসুস্থতার কারণে স্কুলে অনুপস্থিতি বাড়লে পড়াশোনাও ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। চিকিৎসার ব্যয় বহন, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় শিশুরা প্রয়োজনীয় সেবা পেতে পিছিয়ে পড়তে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেন, নগরায়ণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও জলবায়ু পরিবর্তন পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। শিশুদের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমস্যা চিহ্নিত করার পাশাপাশি দ্রুত বাস্তবভিত্তিক ও সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে।
হাসপাতালের পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদারের তাগিদ
নাগরিক সংলাপে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বায়ুদূষণের কারণে শিশুরা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। ধূলিকণা ও ক্ষতিকর কণার সংস্পর্শ এবং শিশুদের তুলনামূলক কম রোগ প্রতিরোধক্ষমতার কারণে তারা বেশি সংবেদনশীল। মায়ের স্বাস্থ্য খারাপ থাকলেও শিশুর স্বাস্থ্যে প্রভাব পড়তে পারে।
তিনি বলেন, শুধু বড় হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসার দিকে না ঝুঁকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও তৃতীয় স্তরের স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে হবে।
জরিপের ফলাফলে নগরের শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্ট হয়েছে। তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় সচেতনতা, নিরাপদ পানি সরবরাহ, উন্নত স্যানিটেশন, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ এবং সহজলভ্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের বসতিগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে উদ্যোগ নেওয়া গেলে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত ক্ষতি কমাতে সহায়তা মিলতে পারে।

