আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইসরায়েলের নির্বাচনের বুথফেরত জরিপে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ক্ষমতাসীন লিকুদ পার্টি এককভাবে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও জোটের শরিক দলগুলোর দুর্বল অবস্থানের কারণে নতুন সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে নেতানিয়াহুবিরোধী শিবিরও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে না পারায় দেশটিতে আবারও রাজনৈতিক অচলাবস্থার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যানের মতে, প্রাথমিক জরিপের ফল চূড়ান্ত ফলাফলে প্রতিফলিত হলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়বে। ইসরায়েলি রাজনীতি ও ফিলিস্তিন সংঘাতবিষয়ক এই বিশেষজ্ঞ আল-জাজিরাকে বলেন, এমন পরিস্থিতিতে নেতানিয়াহুর পক্ষে সরকার গঠন করা প্রায় অসম্ভব হতে পারে।
ইসরায়েলের প্রধান তিনটি টেলিভিশন চ্যানেলের বুথফেরত জরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ২৪ থেকে ২৫টি আসন পেতে পারে। অথচ ২০২২ সালের নির্বাচনে দলটি পেয়েছিল ৩২টি আসন। একই সময়ে নেতানিয়াহুর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা আগের ৬৪ থেকে কমে প্রায় ৫০-এ নেমে আসতে পারে। ফলে একক দল হিসেবে এগিয়ে থাকলেও সরকার গঠনের হিসাব-নিকাশে পিছিয়ে পড়তে পারেন নেতানিয়াহু।
অন্যদিকে, তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোতের ইয়াশার পার্টি ২১ থেকে ২৩টি আসন পেতে পারে বলে জরিপে ধারণা করা হয়েছে। বিরোধী শিবিরের বিয়াখাদ পার্টি ১২ থেকে ১৩টি, আরবদের নেতৃত্বাধীন জোট ১১টি এবং বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস পার্টি ৯ থেকে ১০টি আসন পেতে পারে। এ ছাড়া ইসরায়েল বেইতেনু ৭ থেকে ৮টি এবং আরবপ্রধান রা’আম পার্টি ৭টি আসন পেতে পারে।
অতিধর্মীয় শাস পার্টি ৬ থেকে ৮টি, ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজম ৬ থেকে ৭টি এবং উগ্র ডানপন্থী ওতজমা ইয়েহুদিত ৬ থেকে ৭টি আসন পেতে পারে। রিলিজিয়াস জায়োনিজম পার্টির সম্ভাব্য আসন ছয়টি। তবে কয়েকটি ছোট দল পার্লামেন্টে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ৩ দশমিক ২৫ শতাংশ ভোটের সীমা অতিক্রম করতে না পারলে আসন বণ্টনের হিসাব বদলে যেতে পারে।
জরিপে ভিন্ন চিত্র, জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয়
তবে সব জরিপেই নেতানিয়াহুর জোটকে একই রকম দুর্বল দেখানো হয়নি। সরকারপন্থী চ্যানেল ১৪-এর জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৬২টি আসন পেতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ওই জরিপে বিরোধী শিবিরের সম্ভাব্য আসন ৪০ এবং আরব দলগুলোর ১৮। আই২৪ নিউজের জরিপে নেতানিয়াহুর জোট ৫৫, বিরোধীরা ৪৯ এবং আরব দলগুলো ১৬টি আসন পেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে। নতুন চ্যানেল ১৬-এর জরিপেও জোটগুলোর মধ্যে কাছাকাছি ব্যবধান দেখা গেছে।
এমন ভিন্নতার কারণে চূড়ান্ত ফল প্রকাশের আগে কোনো পক্ষের সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে সরকার গঠনের জন্য ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টির সমর্থন প্রয়োজন। ফলে সবচেয়ে বেশি আসন পাওয়া দলটির পক্ষেও প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছাড়া সরকার গঠন সম্ভব নয়।
২০২২ সালের নির্বাচনে ৬৪টি আসন নিয়ে সরকার গঠন করেছিলেন নেতানিয়াহু। এবারের নির্বাচনের আগে তিনি প্রচার চালিয়েছেন, তার পরাজয় হলে ইসরায়েলের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়তে পারে। এই বক্তব্যে তার সমর্থন কিছুটা বাড়লেও জোটের অন্য দলগুলোর আসন কমে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জরিপের ফল প্রকাশের পর আইজেনকোত দাবি করেন, ইসরায়েলের অধিকাংশ নাগরিক নেতানিয়াহু সরকারের ওপর আস্থা হারিয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, চূড়ান্ত ফল একই রকম হলে তা হবে ইসরায়েলের দায়িত্বশীল ইহুদিবাদী সংখ্যাগরিষ্ঠের বিজয়।
নেতানিয়াহু সরকারকে প্রতিস্থাপন, জনগণের রায় বাস্তবায়ন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ নতুন সরকার গঠনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন আইজেনকোত।
আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বাড়ছে আলোচনা
বিরোধী শিবিরের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসন নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে আরবদের নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিরোধী দলগুলো তাদের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার কাছাকাছি যেতে পারে। এমনকি সরাসরি জোটে না নিয়ে সরকার গঠনের ভোটে তাদের বিরত রাখার মাধ্যমেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের চেষ্টা হতে পারে।
রা’আম পার্টির নেতা মানসুর আব্বাস জানিয়েছেন, সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে দুই রাজনৈতিক শিবিরের নেতারাই তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে তিনি বলেন, ‘সবাই আমাদের সঙ্গে কথা বলছে।’ তবে আইজেনকোতের নেতৃত্বে সরকার গঠনের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ দেখালেও আব্বাস স্বীকার করেছেন, এখনো প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা নিশ্চিত হয়নি।
প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বিরোধী জোটের সম্ভাব্য আসন ৫২ এবং রা’আমের আসন সাতটি। সব আসন একসঙ্গে পেলেও এই সংখ্যা ৫৯, যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১ আসনের চেয়ে দুই কম। ফলে আরও কিছু দলের সমর্থন আদায় করতে হবে বিরোধীদের।
তবে এ পথে রাজনৈতিক বাধাও রয়েছে। ইসরায়েল বেইতেনুর নেতা আভিগদর লিবারম্যান এবং বিয়াখাদ পার্টির নেতা নাফতালি বেনেট আরব দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে সরকার গঠন না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হলে তাদের এই অবস্থান পুনর্বিবেচনার চাপ তৈরি হতে পারে। যদিও ২০২১ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তারা দুজনই আরবদের নেতৃত্বাধীন রা’আমকে অন্তর্ভুক্ত করে গঠিত একটি স্বল্পস্থায়ী সরকারের অংশ ছিলেন।
এদিকে, আরবদের নেতৃত্বাধীন জোটের সম্ভাব্য আসন বৃদ্ধির খবরে দলটির সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। তাদের সদর দপ্তর থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে সমর্থকদের করতালি ও স্লোগান দিতে দেখা যায়। উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভিরের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে নেতারা নেতানিয়াহু সরকার, অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচ এবং বর্তমান সরকারের বিদায়ের দাবি জানান।
ভোটার উপস্থিতিতে নতুন রেকর্ড, সামনে রাজনৈতিক সংকটের আশঙ্কা
ইসরায়েলের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে প্রাথমিক তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। ৭৭ শতাংশের বেশি ভোটার ভোট দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির ভোট গণনা শেষে আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশের পরই আসন বণ্টন ও সরকার গঠনের প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হবে।
প্রাথমিক জরিপে নেতানিয়াহুর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ইঙ্গিত থাকলেও বিরোধীদের জন্যও ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সহজ নয়। আরব দলগুলোর সমর্থন, ছোট দলগুলোর আসনসংখ্যা এবং জোটের শরিকদের অবস্থান—সবকিছুই সরকার গঠনের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে।
কোনো পক্ষই ৬১ আসনের সমর্থন নিশ্চিত করতে না পারলে ইসরায়েলে নতুন নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। সে ক্ষেত্রে নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার কারণে দেশটিতে পাঁচবার নির্বাচন হয়েছিল। এবারের ফলও যদি সরকার গঠনে সমাধান না আনে, তাহলে ইসরায়েল আবারও দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইসরায়েল, আল-জাজিরা

