শূন্য পাসের ২৯৩ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

চলতি বছরের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি—এমন ২৯৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো শুরু হয়েছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া ব্যাখ্যা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে শিক্ষা বোর্ড। পরপর দুই বা তার বেশি বছর শূন্য পাস করা এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

- Advertisement -

তবে অপ্রয়োজনীয় ও অপরিকল্পিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বন্ধ না করে কাছাকাছি থাকা অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত বা পুনর্বিন্যাস করার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের চাকরি বহাল রাখার আশ্বাসও দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।

গত শনিবার প্রকাশিত এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ, যা গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। গত বছরের তুলনায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ২৯ হাজার ১৩ জন। এবার মোট ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন।

ফলাফলের পাশাপাশি বেড়েছে শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও। গত বছর এ ধরনের প্রতিষ্ঠান ছিল ২০২টি। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৯৩টিতে। অর্থাৎ এক বছরে শূন্য পাস প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৯১টি। এর আগে ২০২৪ সালে ৬৫টি, ২০২৩ সালে ৪২টি, ২০২২ সালে ৫০টি এবং ২০২১ সালে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কোনো পরীক্ষার্থী পাস করেননি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় একটি অংশের কার্যক্রম কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। কোথাও শিক্ষক ও অবকাঠামো থাকলেও শিক্ষার্থী নেই, আবার কিছু প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষকও নেই। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এবার অনেক ক্ষেত্রে মাত্র পাঁচ থেকে ১০ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কিছু এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা না থাকলেও ব্যক্তিগত স্বার্থে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। ভবিষ্যতে এমপিওভুক্ত হওয়ার প্রত্যাশায় এসব প্রতিষ্ঠান চালু করা হলেও শিক্ষার মানোন্নয়নে যথাযথ উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ফলে সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে চায় না, ভর্তি হলেও ভালো ফল করতে পারছে না।

এর একটি উদাহরণ নওগাঁর পত্নীতলা সরকারি টেকনিক্যাল কলেজ। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ কলেজ থেকে চলতি বছর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ১০ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের পাঠদানের জন্য কলেজটিতে রয়েছেন ১৭ জন শিক্ষক। কিন্তু পরীক্ষায় একজন শিক্ষার্থীও উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

কলেজটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হামিদুল ইসলাম জানান, অধিকাংশ শিক্ষার্থী অনিয়মিত। পড়াশোনার পাশাপাশি তাঁরা বিভিন্ন কারখানা ও দোকানে কাজ করেন। তাঁদের নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত করানো কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে ফলাফল প্রত্যাশিত হয়নি।

নেত্রকোনা সদর উপজেলার নন-এমপিওভুক্ত ভাষাসৈনিক আবুল হোসেন কলেজেও টানা দুই বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি। চলতি বছর চারজন পরীক্ষায় অংশ নিলেও সবাই অকৃতকার্য হয়েছেন। আগের বছরও দুই পরীক্ষার্থীর কেউ উত্তীর্ণ হননি।

প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ইকবাল হাসান তপু বলেন, কলেজটিতে নিয়মিত কোনো শিক্ষক নেই। প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক ডেকে পাঠদান করানো হয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা না থাকায় প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

একই চিত্র গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার ফকিরহাট মহিলা কলেজ ও সাঘাটা উপজেলার জুমারবাড়ী মহিলা কলেজে। চলতি বছর প্রতিষ্ঠান দুটি থেকে যথাক্রমে দুই ও একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিলেও কেউ পাস করতে পারেননি। ফকিরহাট মহিলা কলেজে টানা তিন বছর ধরে কোনো পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেননি।

কলেজটির অধ্যক্ষ মাহবুবার রহমান রশিদ জানান, ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো শুধু পাঠদানের অনুমোদন পেয়েছে, এমপিওভুক্ত হয়নি। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় অনেক শিক্ষকই প্রতিষ্ঠানে আসেন না। এতে পাঠদান ও ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

এদিকে, এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে একীভূত করার চিন্তাভাবনা করছে সরকার। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা কলেজগুলো রাতারাতি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই সীমিত পরিসরে প্রতিষ্ঠানগুলোর পুনর্বিন্যাসের উপায় খোঁজা হচ্ছে। একীভূত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের চাকরি বহাল থাকবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আখতারুজ্জামান জানান, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। গত পাঁচ বছরের শিক্ষার্থীসংখ্যা, পাসের হার এবং শিক্ষকদের তথ্যও চাওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাব পাওয়ার পর আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে একাধিকবার শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠানো হবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, পরপর দুই বা তার বেশি বছর কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের এমপিও বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, নন-এমপিও প্রতিষ্ঠানগুলোর এমপিওভুক্তির সুযোগও আপাতত দেওয়া হবে না বলে আলোচনা চলছে।

শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, যেসব প্রতিষ্ঠানে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি কিংবা পাসের হার আশঙ্কাজনকভাবে কম, সেগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। এ বিষয়ে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সর্বশেষ