ইসরায়েলের নির্বাচনে বিরোধী জোটের কাছে পিছিয়ে পড়ার পর ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থাকে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন দেশটির বিরোধী রাজনীতিক ও সাংবাদিকেরা। তাদের দাবি, নির্বাচনের ফলাফলকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং বিরোধীদের চাপে রাখতে অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে কাজে লাগাচ্ছেন নেতানিয়াহু।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিকদের মধ্যে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার অংশ নেওয়ার পর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট বিরোধী জোটের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের এক সপ্তাহের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা কমেনি।
নির্বাচনের পর ফিলিস্তিনি ভোটারদের ভোট নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে শিন বেত। সংস্থাটির প্রধান ডেভিড জিনি এ তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ভোট জালিয়াতি, ঘুষ ও বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগে তদন্ত চললেও এখন পর্যন্ত এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের নেতৃত্বাধীন রা’আম ও জয়েন্ট লিস্ট দলকে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দল দুটি একসঙ্গে ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেটে ১৯টি আসন পেয়েছে, যা দেশটির রাজনীতিতে নজিরবিহীন। সমালোচকদের মতে, ক্ষমতা ধরে রাখতেই এসব পদক্ষেপ নিচ্ছেন নেতানিয়াহু।
মঙ্গলবার শিন বেত আটক করে মিডল ইস্ট আইয়ের সহযোগী লেখক আবদ আবু শাহাদেহকে। আটকের বিষয়ে সংস্থাটি নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট তদন্তের কথা জানিয়েছে। এ ছাড়া ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনি ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতা আহমাদ তিবি, সামি আবু শাহাদেহ, মানসুর আব্বাস ও আয়মান ওদেহকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চান।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের অভিযোগ
এ পরিস্থিতিতে বুধবার বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলান ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেন।
তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ কোনো পরোয়ানা ছাড়াই রাজনৈতিক কর্মীদের আটক করছে। পাশাপাশি শিন বেত কোনো প্রমাণ ছাড়াই নির্বাচিত জ্যেষ্ঠ জনপ্রতিনিধিদের জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ নিচ্ছে। বিদায়ী সরকার নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতেও অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
এরপর নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জোর করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করার অভিযোগ তোলেন গোলান।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী নেতা ইয়ার লাপিদও একই ধরনের অভিযোগ করেছেন। মঙ্গলবার দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, নিরাপত্তা সংস্থার ভেতরে সরকারের অনুগত ব্যক্তিদের সহযোগিতায় নেতানিয়াহু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দুর্বল করা এবং নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তার বক্তব্যে শিন বেতের প্রধান ডেভিড জিনির ভূমিকার দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। নেতানিয়াহুই জিনিকে ওই পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন।
বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইজেনকটও সরকারের সমালোচনা করেছেন। তবে তিনি তুলনামূলক সংযত ভাষায় অভিযোগ করেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, রাজপথে সহিংসতায় উসকানি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে দুর্বল করার মধ্য দিয়ে দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করার একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা চলছে।
সাংবাদিকদেরও সমালোচনা
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করার অভিযোগ তুলেছেন ইসরায়েলের সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরাও।
বুধবার হারেৎজ পত্রিকার সাংবাদিক আমোস হারেল লেখেন, প্রধানমন্ত্রী, তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং নিরাপত্তা সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের কিছু সহযোগী মিলে ইসরায়েলকে ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুতর সাংবিধানিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
তার মতে, নেতানিয়াহু রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থায় অভ্যুত্থানের চেষ্টা করছেন। এ জন্য গোয়েন্দা সংস্থার ব্যবহার, সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে উসকানি, সহিংসতার হুমকি এবং নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকারের মতো কৌশল নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক সংবাদমাধ্যম ক্যালকালিস্টের সাংবাদিক মোশে গোরালিও নির্বাচনের ফলাফল মেনে না নেওয়ার বিষয়টিকে বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টির ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার অভিযোগ, নির্বাচনের ফলাফল উল্টে দিতে অনুগত গোয়েন্দা সংস্থাকে ব্যবহার করে সরকার কর্তৃত্ববাদী শাসনের পরিচিত কৌশল অনুসরণ করছে।
এদিকে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়েনেটের সাংবাদিক রোনেন বার্গম্যানের ভাষ্য, দেশটি বর্তমানে অভ্যুত্থানের চেষ্টার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই

