দীর্ঘ বিরতির পর ক্ষমতায় বিএনপি, এবার রাষ্ট্রীয় আয়োজনে ফিরছে ৭ নভেম্বর

প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনে নয়াপল্টন থেকে বর্ণাঢ্য র‍্যালি, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে ঐক্য, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক :
spot_img

নিজস্ব প্রতিবেদক : আজ ৭ নভেম্বর, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের আলোচিত ও ঘটনাবহুল এই দিনটি এবার ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায় উদযাপন করছে বিএনপি। দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর দলটি রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় দিবসটি ঘিরে নেওয়া হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলা ও মহানগরে র‍্যালি, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করবে দল ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। ঢাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

- Advertisement -

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্য ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। ওই দিনের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করে। বিএনপি দিনটিকে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করে আসছে। দলটির নেতাদের মতে, এই দিনের মূল চেতনা ছিল জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা।

যেভাবে ঘটেছিল ৭ নভেম্বরের পটপরিবর্তন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি ক্রমেই অস্থির হয়ে ওঠে। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এরপর সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ তাঁর অনুসারী সেনাসদস্যদের নিয়ে অভ্যুত্থান ঘটান। এ সময় সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে গৃহবন্দি করা হয়। খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান ঘোষণা করেন। ৬ নভেম্বর বঙ্গভবনে গিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদকে গ্রেপ্তার করেন। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভা বাতিল ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এ অবস্থায় সেনাবাহিনীর সাধারণ সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁদের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে সাধারণ মানুষও রাজপথে নেমে আসে। ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। পাল্টা অভ্যুত্থানের সময় খালেদ মোশাররফ তাঁর কয়েকজন সহযোগীসহ নিহত হন। এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ৭ নভেম্বরের পটপরিবর্তন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক কাঠামো, রাষ্ট্র পরিচালনা ও সামরিক-বেসামরিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিএনপির রাজনৈতিক ইতিহাসেও দিনটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

নয়াপল্টন থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে র‍্যালি

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে ৫ নভেম্বর থেকে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো। মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ শনিবার বিকেল ৩টায় নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য র‍্যালির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

শুক্রবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগরে দিবসটি উপলক্ষে র‍্যালি অনুষ্ঠিত হবে।

ঢাকার র‍্যালিটি নয়াপল্টন থেকে শুরু হয়ে কাকরাইল, প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়, বাংলামটর ও ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হবে।

এর আগে সকাল সাড়ে ৮টায় শেরেবাংলা নগরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা জানাবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা।

সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচির আওতায় বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও পৃথক আয়োজন করেছে। ১০ নভেম্বর যুবদলের আলোচনা সভা, ৫ নভেম্বর শ্রমিক দলের আলোচনা সভা এবং ৯ নভেম্বর কৃষক দলের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। একই দিন বিকেলে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ছাত্রদল আজ সকাল ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং ৮ নভেম্বর আলোচনা সভা করবে। ওলামা দল এতিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করবে। ৮ নভেম্বর দেশের বিভিন্ন থানা ও উপজেলা পর্যায়েও র‍্যালি করার কর্মসূচি রয়েছে।

রাষ্ট্রপতির বাণীতে দুর্নীতি ও বৈষম্য দূর করার আহ্বান

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী বীর সেনানী ও দেশপ্রেমিক জনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনি।

রাষ্ট্রপতি বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দলমত নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতি, বৈষম্য ও ষড়যন্ত্রের অবসানে কাজ করতে হবে। ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ দর্শনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হবে উল্লেখ করে তিনি জাতীয় স্বার্থ, সাম্য, ন্যায্যতা ও গণতন্ত্রচর্চাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।

বাণীতে তিনি আরও বলেন, ৭ নভেম্বরের ধারাবাহিকতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বাক্‌স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামাজিক শান্তি প্রতিষ্ঠায়ও তাঁর ভূমিকা ছিল বলে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে দেশ আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রত্যয়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বাণীতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গতিপথ নির্ধারণকারী ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেন, যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিয়ে একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল এবং সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ন করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বরের দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, সেদিন সিপাহি ও জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র প্রতিহত করেছিল। তাঁর ভাষায়, ৭ নভেম্বর ছিল বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন। বাণীতে দিবসটি উপলক্ষে জাতীয়ভাবে গৃহীত সব কর্মসূচির সফলতা কামনা করেন তিনি।

রাজনৈতিক ইতিহাসে দিবসটির তাৎপর্য

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বরাবরই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ও মূল্যায়ন রয়েছে। বিএনপি দিনটিকে জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় সিপাহি-জনতার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গেও দিনটি গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

বিএনপি সরকারের আমলে ৭ নভেম্বর সরকারি ছুটি হিসেবে পালিত হতো। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে দলটি দিনটি বড় পরিসরে উদযাপনের সুযোগ পায়নি বলে বিএনপির নেতারা অভিযোগ করে আসছেন।

দীর্ঘ বিরতির পর এবার রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে দিবসটি উদযাপন বিএনপির জন্য রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। তবে দিবসটির ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাণীতে দুর্নীতি, বৈষম্য দূর করা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার যে আহ্বান এসেছে, তা বর্তমান রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে।

সর্বশেষ