নিজস্ব প্রতিবেদক : জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের আট অভিযোগে করা মামলায় জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর মৃত্যুদণ্ড চেয়ে আপিল করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউশন।
রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ট্রাইব্যুনালে এ আপিল করা হয়। এর আগে গত ৩০ জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ইনুকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল-২। একই রায়ে দুটি অভিযোগে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ টাকা করে মোট দুই লাখ টাকা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় দেন।
মামলায় ইনুর বিরুদ্ধে মোট আটটি অভিযোগ আনা হয়েছিল। এর মধ্যে তৃতীয় অভিযোগে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ষষ্ঠ ও সপ্তম অভিযোগে এক লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণসহ ১০ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তবে পৃথক অভিযোগে সাজা হলেও তা একসঙ্গে কার্যকর হওয়ায় ইনুকে মোট ১০ বছর কারাভোগ করতে হবে। অন্যদিকে প্রথম, দ্বিতীয়, চতুর্থ, পঞ্চম ও অষ্টম অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেন ট্রাইব্যুনাল।
দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৫ মার্চ হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটরের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর ২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। একই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে ইনুর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে প্রসিকিউশন ও আসামিপক্ষের শুনানি শেষে ২ নভেম্বর আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল-২।
গত বছরের ৩০ নভেম্বর মামলায় সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। ১ ডিসেম্বর শুরু হয় সাক্ষ্যগ্রহণ। তদন্তকারী কর্মকর্তা ছাড়াও ইনুর বিরুদ্ধে মোট ১০ জন সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষের হয়ে সাফাই সাক্ষ্য দেন দুজন।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের ২ এপ্রিল থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। প্রথমে আসামিপক্ষ এবং পরে প্রসিকিউশন তাদের যুক্তি উপস্থাপন করে। ১৪ মে যুক্তিতর্ক শেষ হলে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল-২।
সাক্ষ্য-প্রমাণে যা উঠে আসে
মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষী জবানবন্দি দেন। তাদের মধ্যে ছিলেন তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী, দুই বিশেষজ্ঞ, একজন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য, দুজন জব্দতালিকা সাক্ষী, একজন জেলার সাক্ষী এবং একজন তদন্ত কর্মকর্তা। মামলায় ২০ সিরিজের নথি এবং পাঁচটি বস্তু প্রদর্শন করা হয়।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই ভারতের মুম্বাইভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘মিরর নাউ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আন্দোলনকারীদের বিএনপি-জামায়াত ও সন্ত্রাসী-জঙ্গি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ বলপ্রয়োগে উসকানি দেন ইনু।
এর পরদিন ১৯ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গণভবনে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও তিনি অংশ নেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, ১৪ দলীয় জোটের ওই বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে ‘শ্যুট অ্যাট সাইট’ নির্দেশনা কার্যকর করার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখেন ইনু।
কুষ্টিয়ায় ছয়জন নিহতের অভিযোগ
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, ২০ জুলাই আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে ইনু কুষ্টিয়ার তৎকালীন পুলিশ সুপারকে ফোন করে আন্দোলনকারীদের ছবি দেখে তালিকা তৈরি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।
প্রসিকিউশনের দাবি, ওই নির্দেশনা বাস্তবায়নে পুলিশ ও ১৪ দলীয় জোটের সশস্ত্র ব্যক্তিদের নিয়ে কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালানো হয় এবং ৫ আগস্ট পর্যন্ত আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়। এসব ঘটনায় শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ নিহত হন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া আন্দোলন দমনে মারণাস্ত্র ব্যবহার, হেলিকপ্টার থেকে গুলি, বোমাবর্ষণ, ছত্রীসেনা মোতায়েন এবং আটক ও নির্যাতনের পরিকল্পনা ও উসকানির অভিযোগও আনা হয় ইনুর বিরুদ্ধে।
প্রসিকিউশনের ভাষ্য অনুযায়ী, ২৯ জুলাই শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ১৪ দলীয় জোটের আরেকটি বৈঠকেও ইনু উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকে বিভিন্ন বক্তব্য ও প্রস্তাবের মাধ্যমে আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জোটের সশস্ত্র ক্যাডারদের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন ও বৈধতা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগের দিন ৪ আগস্ট কারফিউ জারি এবং গুলি চালিয়ে ছাত্র-জনতা হত্যাসহ তৎকালীন সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে অনুমোদন করেন ইনু।
এখন ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ১০ বছরের সাজা বাতিল করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের করা আপিলের ওপর উচ্চতর বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।




