ট্রাম্পের চাপে কোণঠাসা ইরান, তবু নতি স্বীকার নয়

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধে ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে ইরানের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। তেল বিক্রি থেকে আয় কমে যাওয়া, অপরিশোধিত তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসা এবং লাগামহীন মূল্যস্ফীতিতে দেশটির অর্থনীতি বড় সংকটের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতেও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না তেহরান।

- Advertisement -

সামুদ্রিক বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য বলছে, গত সেপ্টেম্বর ইরানের বন্দর থেকে কোনো অপরিশোধিত তেল রপ্তানি হয়নি। ২০১৩ সালে ইরানের তেল রপ্তানি পর্যবেক্ষণ শুরুর পর এই প্রথম কোনো এক মাসে দেশটির কোনো অপরিশোধিত তেল ট্যাংকারে তোলা সম্ভব হয়নি।

কেপলারের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতার বাইরে থাকা ইরানের তেলের মজুতও দ্রুত কমে যাচ্ছে। জুলাইয়ে যেখানে এ মজুতের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ কোটি ব্যারেল, সেখানে তা কমে এখন প্রায় এক কোটি ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে।

দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মোহসেন রেজাইও বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার করেছেন। তাঁর ভাষায়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান ইতিহাসের অন্যতম কঠিন অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তবে এত চাপের মধ্যেও সরকারের অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনা নেই বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।

রেজাইয়ের মতে, জনগণের দুর্ভোগ মোকাবিলায় ইরান সরকারের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক কাঠামো এবং কঠোরভাবে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের নীতিও সরকারকে অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা সামলাতে কিছুটা সহায়তা করছে।

ইরানের এই অনমনীয় অবস্থানের পেছনে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার বিভিন্ন উদ্যোগও কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কেপলারের নীতি ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকিবিষয়ক প্রধান মিশেল ব্রুহার্ডের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে যে নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে তেল বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা এখনও অব্যাহত রয়েছে।

অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা

অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতিও জোরদার করছে ইরান। দেশটির সেনাবাহিনী জানিয়েছে, আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের বড় মজুত গড়ে তোলা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎপাদনে যে গতি এসেছিল, তা এখন আরও বাড়ানো হয়েছে বলে দাবি করেছে তেহরান।

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে পানামার পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাঙ্কার এমটি অন পিসে হামলার ঘটনায় ১২ নাবিক আহত হয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাহাজটিতে মোট ১৯ জন নাবিক ছিলেন, যাদের ১৭ জন ভারতীয়। আহতদের মধ্যে ১১ জন ভারতের নাগরিক।

হুমকির পর বোমারু বিমান সরাল যুক্তরাষ্ট্র

ইরানকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, সম্ভাব্য হুমকির কারণে যুক্তরাজ্যের আরএএফ ফেয়ারফোর্ড ঘাঁটি থেকে মার্কিন বোমারু বিমান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

নেব্রাস্কার উদ্দেশে যাত্রার সময় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, একটি হুমকির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র অবগত ছিল, যার কারণে বোমারু বিমানগুলো সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

একই সময়ে ক্যালিফোর্নিয়ার দুই বড় শহর লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান দিয়েগোতে ইরানকে হামলার সুযোগ দেওয়া উচিত বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনা নিয়ে প্রশ্ন পেজেশকিয়ানের

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান আলোচনাকে ‘অর্থহীন’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ওয়াশিংটন আসলে সংলাপের মাধ্যমে সমাধান চায় না।

গত সোমবার আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান যখনই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় বসে, তখনই তাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, এমন পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে যুক্তরাষ্ট্র প্রকৃত অর্থে আলোচনায় আগ্রহী নয়।

মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা গুতেরেসের

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার মধ্যেই পাকিস্তান সফরে গেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। ইসলামাবাদে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের অবসান এবং আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।

সব মিলিয়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানির সংকট এবং সামরিক উত্তেজনা—তিন দিক থেকেই চাপের মধ্যে রয়েছে ইরান। তবু পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আপসের কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত এখনও নেই তেহরানের পক্ষ থেকে। ফলে অর্থনৈতিক চাপের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনাও আরও কতটা বাড়ে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সর্বশেষ