চার দিনের সফরে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতার আলোচনা, টয়োটার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়ে আগ্রহ; কর্মসংস্থান, ব্যবসা ও দূতাবাসের সেবা উন্নয়নে উদ্যোগ চান প্রবাসীরা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে ঘিরে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে বাংলাদেশ ও জাপানের ব্যবসায়ী, কূটনৈতিক মহল এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে এ সফরের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি এবং প্রবাসীদের ব্যবসায়িক জটিলতা নিরসনের বিষয়গুলো সফরে গুরুত্ব পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার গঠনের পর মালয়েশিয়া, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এবার জাপান সফর হবে তার চতুর্থ বিদেশ সফর। আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর চার দিনের এ সফরে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি সম্রাট নারুহিতোর সঙ্গে সাক্ষাতের কর্মসূচি রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সফরকে সামনে রেখে দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়ে আলোচনা চলছে। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কৃষি, জ্বালানি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের মতো বিষয়গুলো আলোচনায় স্থান পেতে পারে। একই সঙ্গে জাপানি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টয়োটার বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা নিয়েও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টিকে সম্ভাবনা হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী জাপান। দীর্ঘদিন ধরে দেশটি বাংলাদেশের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিল্প উন্নয়নে সহযোগিতা করে আসছে। নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক আরও এগিয়ে নেওয়া এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্বের ক্ষেত্র সম্প্রসারণের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে তারেক রহমানের এ সফরকে।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের পাশাপাশি জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, জ্বালানি, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থানের মতো খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি নিয়েও প্রস্তুতি চলছে। এর মধ্যে শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং জনশক্তি রপ্তানিসংক্রান্ত সমঝোতার বিষয়টিও রয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণ ১২ আগস্ট ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-জাপান সপ্তম পররাষ্ট্র দপ্তর পরামর্শ সভায় বাংলাদেশের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। এরপর থেকে সফরের কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কাজ করছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. শাকিরুল ইসলাম খান শাকিল বলেন, জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। প্রায় ২০ বছর পর জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপক্ষীয় সফরে দেশটিতে যাচ্ছেন। দুই দেশের সরকারপ্রধান ও উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হবে। তবে সফরের কর্মসূচি চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।
দক্ষ কর্মীদের জন্য খুলতে পারে নতুন সুযোগ
জাপানের শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টি সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হতে পারে। দেশটিতে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির চাহিদা থাকায় বাংলাদেশ এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মো. শামীমের মতে, জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব জোরদারে এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তার ভাষ্য, দক্ষ জনশক্তি ও কর্মসংস্থান বিষয়ে সমঝোতা হলে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য জাপানের শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়তে পারে। এতে বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী আয় বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
তিনি মনে করেন, জাপানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ধরে রাখা, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা মোকাবিলা এবং বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র তৈরির জন্যও এ সফর তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
প্রবাসীদের প্রত্যাশার কেন্দ্রে ব্যবসা ও নাগরিক সেবা
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশিদের মধ্যে উৎসাহ দেখা দিয়েছে। তাদের প্রত্যাশা, দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পাশাপাশি প্রবাসীদের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানেও সরকার কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
টোকিওতে বাংলাদেশের দূতাবাসের সেবা আধুনিক করা, ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা কমানো, গাড়ি আমদানি ও ব্যবসায়িক লেনদেনে ঋণপত্র বা এলসি-সংক্রান্ত সমস্যা সমাধান, জাপানে ব্যবসায়িক সহায়তা কেন্দ্র স্থাপন এবং বাংলাদেশে প্রবাসীদের বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ ছাড়া জাপানে কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, কর্মীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং দক্ষতা ও প্রযুক্তি বিনিময়ের ওপর জোর দিচ্ছেন প্রবাসীরা। তাদের মতে, প্রবাসীদের সমস্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ এবং সেই অনুযায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া গেলে দুই দেশের সহযোগিতা আরও কার্যকর হবে।
জাপান বিএনপির সভাপতি ও ব্যবসায়ী রেজা মীর বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর জাপানপ্রবাসীদের জন্য আনন্দের। তাকে স্বাগত জানাতে টোকিওর নারিতা বিমানবন্দরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি জাপানপ্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর মতবিনিময় সভা আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি বলেন, জাপানে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হন। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের উদ্যোগ প্রত্যাশা করেন তারা। একই সঙ্গে ঢাকা-টোকিও সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টিকেও গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন তিনি।
ব্যবসায়ী মাসুম জাকির বলেন, জাপানে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যবসার সুযোগ বাড়াতে একটি কার্যকর চেম্বার গঠন প্রয়োজন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য পাশে রেখে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোও জরুরি। তার মতে, প্রবাসীদের বাস্তব সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের প্রস্তাব সরকারের কাছে তুলে ধরতে হবে।
জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর তাগিদ
জাপানপ্রবাসী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জনি মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ তৈরি করবে। তার মতে, তথ্যপ্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, হালকা প্রকৌশল, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো খাতে দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি বলেন, জাপানে বসবাসরত বাংলাদেশি উদ্যোক্তা ও পেশাজীবীরা দুই দেশের ব্যবসায়িক যোগাযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। জাপানের বাজার, ব্যবসায়িক সংস্কৃতি ও বিনিয়োগের পরিবেশ সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে জাপানি কোম্পানির সম্পর্ক তৈরি করা সম্ভব।
এ জন্য প্রবাসী উদ্যোক্তাদের নিয়ে একটি হালনাগাদ ও স্বচ্ছ ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ, নীতির ধারাবাহিকতা, চুক্তি বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে বলে মনে করেন এই প্রকৌশলী।
ঢাকা-টোকিও সরাসরি ফ্লাইটে স্বস্তি
জাপানপ্রবাসী বাংলাদেশিদের দীর্ঘদিনের দাবির মধ্যে অন্যতম ছিল ঢাকা-টোকিও সরাসরি বিমান চলাচল। এক বছরের বেশি সময় বন্ধ থাকার পর গত ২৬ জুলাই থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এ রুটে সরাসরি ফ্লাইট চালু করে। প্রথম দিকে সপ্তাহে একটি ফ্লাইট চললেও পরে তা বাড়িয়ে সপ্তাহে দুই দিন করার কথা জানানো হয়েছে। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, সোমবার ও বৃহস্পতিবার এ রুটে ফ্লাইট চলাচলের কথা রয়েছে।
প্রবাসীদের মতে, সরাসরি বিমান যোগাযোগ জোরদার হলে দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি ব্যবসা, বিনিয়োগ, শিক্ষা, পর্যটন ও পারিবারিক যোগাযোগেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তাদের প্রত্যাশা, ফ্লাইটের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি টিকিটের মূল্য সহনীয় রাখা এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত করার বিষয়েও সরকার নজর দেবে।
বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, জাপান সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, জাপান বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশটির বিনিয়োগ ও সহযোগিতায় বাস্তবায়িত বিভিন্ন বড় প্রকল্প দুই দেশের সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে। আগামী দিনেও পারস্পরিক বিনিয়োগ এবং খাতভিত্তিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ খুঁজে দেখতে চায় বাংলাদেশ।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন সফরে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে তারেক রহমানের জাপান সফরকে ঘিরে প্রত্যাশা কেবল কূটনৈতিক সম্পর্কের আনুষ্ঠানিকতা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়। বাণিজ্য সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ, দক্ষ কর্মীদের কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানের মতো বাস্তব বিষয়গুলোতে কী ধরনের অগ্রগতি হয়, এখন সেদিকেই নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা। সফরে আলোচনার বিষয়গুলো কার্যকর চুক্তি ও বাস্তব উদ্যোগে রূপ নিলে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক নতুন গতি পেতে পারে।

