ফ্রান্সে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, ভাঙচুর ও লুটপাট অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্যারিস, লিল, নিসসহ কয়েকটি শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় আংশিক কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগে সরকারের ওপর চাপ বাড়ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা। সপ্তাহান্তের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে প্রায় তিন হাজার দোকান।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরের কিছু এলাকায় কারফিউ ও বিক্ষোভের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের পর দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ এবং সপ্তাহান্তে ব্যাপক লুটপাটের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিধিনিষেধ
ফরাসি রাজধানী প্যারিসের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সন্ধ্যা ৮টা থেকে বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করেছে পুলিশ। এ ছাড়া প্রজাতন্ত্র চত্বর (প্লেস দ্য লা রিপাবলিক) ও লে আলে এলাকায় রাত ১১টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত কারফিউ জারি করা হয়েছে। মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত এসব বিধিনিষেধ কার্যকর থাকার কথা জানায় পুলিশ।
এক বিবৃতিতে প্যারিস পুলিশ জানায়, নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু পুরো প্যারিসে কারফিউ জারির সম্ভাবনা নাকচ করলেও জরুরি অবস্থা ঘোষণার বিষয়টি উড়িয়ে দেননি। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট এলাকা ও স্থানীয় পর্যায়ে কারফিউ জারি করাই বেশি কার্যকর হতে পারে। তিনি বলেন, শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তাঁর সংকল্প অটুট।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, স্থানীয় মেয়রদের সম্মতিতে লিল, দুয়ে, ভাতিগ্নি ও দানাঁ শহরে পরবর্তী দুই দিনের জন্য অপ্রাপ্তবয়স্কদের রাত ৮টা থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত বাইরে চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। নিসের মেয়র এরিক সিওত্তিও শহরের কেন্দ্রস্থলে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাতের কারফিউ জারির আদেশে সই করেছেন। অন্যদিকে, মার্সেইতে জমায়েত ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
চরম বামপন্থীদের দায়ী করছে সরকার
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতার জন্য চরম বামপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু। তাঁর অভিযোগ, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দেশে গভীর অস্থিরতা তৈরি করতে চায় এমন একটি চরম বামপন্থী আন্দোলন সক্রিয় রয়েছে।
তবে এই অভিযোগের প্রমাণ দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কট্টর বামপন্থী নেতা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-ল্যুক মেলেশোঁ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি বলেন, অভিযোগের প্রমাণ দিতে না পারলে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমা চাওয়া উচিত। একই সঙ্গে অস্থিরতা উসকে দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, ফরাসি ট্রেড ইউনিয়নগুলো আগামী ৫ নভেম্বর নতুন করে ধর্মঘট ও সমাবেশের ডাক দিয়েছে। ফলে চলমান বিক্ষোভের পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তিন হাজার দোকানে ক্ষয়ক্ষতি
সহিংসতা ও লুটপাটের বড় ধরনের অর্থনৈতিক প্রভাব পড়েছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। ফরাসি বাণিজ্য ও খুচরা বিক্রেতা ফেডারেশনের হিসাবে, সপ্তাহান্তে প্রায় তিন হাজার দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফেডারেশন বলেছে, লুটপাটের কারণে শুধু দোকানমালিকেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হননি; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কর্মী ও তাঁদের পরিবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। কয়েক ঘণ্টার সহিংসতায় বহু বছরের পরিশ্রমে গড়ে তোলা ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে উল্লেখ করে সংগঠনটি। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা ও কর ছাড়ের দাবি জানিয়েছে তারা।
প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু জানিয়েছেন, কর্মী ছাঁটাই ঠেকাতে মঙ্গলবার থেকে বিশেষ সাময়িক ব্যবস্থা বা ফার্লো কর্মসূচি চালু করবে সরকার। এর মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের চাকরি ধরে রাখতে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
অনলাইনে লুটের পণ্য বিক্রি ঠেকানোর উদ্যোগ
লুট করা পণ্য অনলাইনে বিক্রির অভিযোগে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার। ডিজিটাল মন্ত্রী আন ল্য এনাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, লুট করা পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন সরিয়ে নিতে এবং সংশ্লিষ্ট বিক্রেতাদের বিচারের আওতায় আনতে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং প্রায় ১ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। শনিবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে এক বিক্ষোভকারীর মৃত্যুর কথাও জানানো হয়েছে।
অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে রাজনৈতিক সংকট
ফ্রান্সে চলমান অস্থিরতা এমন সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যখন দেশটি দুর্বল অর্থনীতি ও বিপুল সরকারি ঋণের চাপ সামলাচ্ছে। কয়েক সপ্তাহের ছাত্র বিক্ষোভের পর দেশজুড়ে সহিংসতা ও লুটপাট সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
সামনে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থাকায় পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একদিকে সরকার নিরাপত্তা জোরদার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে সহায়তার উদ্যোগ নিচ্ছে, অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ বাড়ছে। নতুন ধর্মঘটের কর্মসূচি সামনে থাকায় দেশটির পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

