যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক চাপের মুখে ইরান কখনো আত্মসমর্পণ করবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের সঙ্গে চলমান কূটনৈতিক আলোচনা সফল করতে যুক্তরাষ্ট্রকে আগের প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তাঁর মতে, পারস্পরিক সমঝোতা ও আস্থার ভিত্তি তৈরি না হলে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রাতে ইরাকি গণমাধ্যম নেটওয়ার্ক আল-আখবারিয়াকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন আরাগচি। মেহের নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনা চলছে। তবে আলোচনার অগ্রগতি নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতি রক্ষার ওপর।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু শুধু ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নয়। তাঁর দাবি, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধিতা এবং তেহরানের ওপর নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাই দ্বন্দ্বের অন্যতম প্রধান কারণ। পরমাণু ইস্যুকে এই বৃহত্তর বিরোধের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
আরাগচির ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি পরিস্থিতি মেনে নিতে চায় না, যেখানে ইরান মার্কিন আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করে স্বাধীনভাবে নিজের অবস্থান বজায় রাখবে। এ কারণে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অতীতের আলোচনার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আরাগচি বলেন, দুই দেশের মধ্যে এর আগে তিন দফা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই আলোচনার পর ইরানকে সামরিক হামলার মুখে পড়তে হয়েছে বলে তাঁর অভিযোগ। গত বছরের জুনে এবং চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তিনি।
আরাগচির দাবি, দুই দফা হামলার সময়ই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনা চলছিল। এ ছাড়া গত জুনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় হওয়া একটি সমঝোতা স্মারকের শর্তও যুক্তরাষ্ট্র পরে লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রাখা কঠিন বলে মন্তব্য করেন ইরানের এই শীর্ষ কূটনীতিক।
তবে কূটনৈতিক উদ্যোগ পুরোপুরি ব্যর্থ হতে দিতে চায় না তেহরান। এ লক্ষ্যে হরমুজ প্রণালি নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে সাত দিনের একটি পরিকল্পনা প্রস্তাব করেছে ইরান। আরাগচির বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরিকল্পনার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটি পুনরায় চালুর পথ তৈরি করা।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রকে ইসলামাবাদে হওয়া সমঝোতা স্মারকের অধীনে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। এরপর হরমুজ প্রণালির বিষয়ে উভয় পক্ষকে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। সম্মত শর্ত অনুযায়ী নৌপথটি পুনরায় চালু করা হলে পরবর্তী ধাপে একটি চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা যেন পুরোপুরি ভেস্তে না যায়, সে বিবেচনা থেকেই এই পরিকল্পনা সামনে আনা হয়েছে। তবে এর সফলতা নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ওপর। ওয়াশিংটন পূর্ববর্তী সমঝোতাগুলো মেনে চললে আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
আরাগচির বক্তব্যে একদিকে যেমন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তেহরানের গভীর অবিশ্বাসের চিত্র উঠে এসেছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের পথও খোলা রাখার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। তবে হরমুজ প্রণালি নিয়ে প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং দুই দেশের মধ্যে চূড়ান্ত সমঝোতা কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করছে আগামী দিনের আলোচনার ওপর।
সূত্র: মেহের নিউজ এজেন্সি

