ফ্রান্সে শিক্ষার্থী আন্দোলনে আলোচনায় ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগান

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি। গত সপ্তাহে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া অনেকের প্ল্যাকার্ডে দেখা যায় এই বাক্য। আরবি ও ফরাসি ভাষার সংমিশ্রণে তৈরি স্লোগানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এর অর্থ, উৎপত্তি ও রাজনৈতিক তাৎপর্য নিয়ে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

- Advertisement -

আরবি ‘বিসমিল্লাহ’ শব্দের অর্থ আল্লাহর নামে শুরু করা। অন্যদিকে, ফরাসি ‘সে লে তেনেব্র’ কথাটির অর্থ ‘এটি অন্ধকার’। দুটি ভাষার শব্দ মিলিয়ে তৈরি বাক্যটির সরাসরি অর্থ স্পষ্ট নয়। তবে আন্দোলনকারীদের কাছে এটি কেবল একটি ব্যতিক্রমী বাক্য নয়; বরং কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তরুণদের দূরত্ব, পুলিশের নজরদারি নিয়ে সন্দেহ এবং রাজনৈতিক ব্যঙ্গ প্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

গত মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আন্দোলন বিস্তৃত হয়ে একপর্যায়ে সহিংসতার রূপ নেয়। এ পরিস্থিতিতে আলোচিত স্লোগানটি বিক্ষোভকারীদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পায়।

স্ন্যাপচ্যাটের বার্তা থেকে স্লোগানের সূত্রপাত

স্লোগানটির উৎপত্তি নিয়ে যে ধারণা সামনে এসেছে, তার সূত্রপাত স্ন্যাপচ্যাটে পাঠানো একটি বার্তা থেকে। ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনের আয়োজকদের একটি ব্যক্তিগত চ্যাট গ্রুপে প্রবেশের চেষ্টার সময় বার্তাটি পাঠানো হয়েছিল বলে জানা যায়।

বার্তাটির শুরুতে ছিল ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’। এরপর লেখা হয়, ‘আমরা সবকিছু ভেঙে ফেলব।’ ফ্রান্সের তরুণদের মধ্যে প্রচলিত আরবি ও ফরাসি ভাষার মিশ্র কথ্যরীতির অনুকরণে বার্তাটি তৈরি করা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মামাদৌ ও আবদুল্লাহর মতো নাম এবং আলজেরিয়ার পতাকার ইমোজি ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রোফাইল থেকে একই ধরনের বার্তা পাঠানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে। বার্তাগুলোর ভাষা ও উপস্থাপনাকে অনেক ব্যবহারকারী ব্যঙ্গাত্মক ও হাস্যকর মনে করেন। পরে সেগুলোর স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি দ্য নিউইয়র্ক টাইমস।

নজরদারি নিয়ে সন্দেহ, পুলিশের প্রতি অবিশ্বাস

অনেক তরুণের সন্দেহ, বার্তাগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের পাঠানো হয়ে থাকতে পারে। তাদের ধারণা, আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত যোগাযোগে প্রবেশ করে বিক্ষোভের পরিকল্পনা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে এ অভিযোগের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ প্রকাশিত হয়নি।

এই সন্দেহ থেকেই স্লোগানটি আন্দোলনকারীদের কাছে ব্যঙ্গের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। তাদের মতে, তরুণদের ভাষা ও আচরণ অনুকরণ করে আন্দোলনে অনুপ্রবেশের চেষ্টা কিংবা বিক্ষোভকারীদের সম্পর্কে কর্তৃপক্ষের ধারণাকে উপহাস করার মাধ্যম হিসেবে এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

ফ্রান্সে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাসও এ বিতর্কে উঠে এসেছে। বিশেষ করে কৃষ্ণাঙ্গ, আরব বংশোদ্ভূত এবং সাবেক ফরাসি উপনিবেশ থেকে আসা অভিবাসী পরিবারের অনেক তরুণের অভিযোগ, তাঁরা বৈষম্য ও পক্ষপাতের শিকার হন। তাদের আশঙ্কা, নতুন এই বার্তাগুলোও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর তরুণদের সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর প্রবণতা তুলে ধরছে।

অন্যদিকে, ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বার্তাগুলো তাদের কোনো কর্মকর্তা পাঠিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে সরাসরি মন্তব্য করেনি। তবে মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বেআইনি কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা শনাক্ত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা কখনো কখনো অনলাইনে ছদ্মপরিচয় ব্যবহার করেন। তদন্তের প্রয়োজনে ছদ্মনাম ব্যবহার করে অপরাধসংশ্লিষ্ট যোগাযোগ শনাক্ত ও সংরক্ষণ করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে এসব তথ্য আইনি প্রক্রিয়ায় প্রমাণ হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

তরুণদের কাছে কেন জনপ্রিয় এই বাক্য?

আন্দোলনকারীদের কাছে স্লোগানটির জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে কর্তৃপক্ষের প্রতি ক্ষোভ, ব্যঙ্গ এবং নিজেদের মধ্যে সংহতি প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা। তাদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের দাবিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। একই সঙ্গে আন্দোলন পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধেও তারা এই বাক্যের মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

ফ্রান্সের একটি প্রভাবশালী শিক্ষার্থী ইউনিয়নের মুখপাত্র সাবরিন খারবাচের মতে, তরুণেরা সাধারণত এভাবে কথা বলেন না। তাঁর বক্তব্য, স্লোগানটিকে নিজেদের করে নেওয়ার মাধ্যমে তারা বোঝাতে চাইছেন, আন্দোলনে নজরদারি বা অনুপ্রবেশের চেষ্টা সম্পর্কে তাঁরা সচেতন এবং তারপরও সংগঠিত থাকতে সক্ষম।

বোর্দো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদানি সাবাদি মনে করেন, স্ন্যাপচ্যাটের বার্তাগুলো কর্তৃপক্ষের পূর্বধারণা ও পক্ষপাতের বিষয়টি সামনে এনেছে। তাঁর মতে, কারা ব্যারিকেড তৈরি করছে কিংবা কারা ভাঙচুরে জড়াতে পারে, সে বিষয়ে আগেভাগেই ধারণা করে নেওয়ার প্রবণতা রয়েছে।

প্যারিসের একটি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফেদ্রে কেমেনও স্লোগানটিকে তরুণদের নিয়ে তৈরি ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, এটি তরুণদের ভাষা ও আচরণ অনুকরণ করার একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার মতো শোনায়। একই সঙ্গে অনেকে বাক্যটিকে বর্ণবাদী ধারণার প্রতিফলন হিসেবেও দেখছেন, কারণ এতে আরব বংশোদ্ভূত তরুণদের সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত করে দেখানোর আশঙ্কা তৈরি হয়।

ফ্রান্স ছাড়িয়ে অন্য দেশেও ছড়িয়েছে স্লোগান

ফ্রান্সে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ স্লোগানটি বেলজিয়াম ও জার্মানির অনুরূপ বিক্ষোভেও ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি দেশের শিক্ষার্থী আন্দোলনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে।

সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানিয়ে ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে বাক্যটি উচ্চারণ করেন। ভিডিওতে তিনি জেন-জি প্রজন্মের তরুণদের মধ্যে পরিচিত কয়েকটি অঙ্গভঙ্গিও প্রদর্শন করেন। এর মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ‘সিক্স-সেভেন’ মিমের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি অঙ্গভঙ্গি ছিল।

স্লোগানটির জনপ্রিয়তার সঙ্গে ভারতের শিক্ষার্থী আন্দোলনে ব্যঙ্গাত্মক শব্দ ব্যবহারের প্রবণতারও কিছু মিল দেখা যাচ্ছে। ভারতে উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীরা একটি ব্যঙ্গাত্মক শব্দকে নিজেদের পরিচয়ের অংশ করে নিয়েছিলেন। দেশটির প্রধান বিচারপতির তরুণ ও বেকারদের নিয়ে করা বিতর্কিত মন্তব্যের পর ওই শব্দকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদের একটি ধারা তৈরি হয়।

সব মিলিয়ে, ‘বিসমিল্লাহ, সে লে তেনেব্র’ এখন ফ্রান্সের শিক্ষার্থী আন্দোলনে ব্যঙ্গ, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও কর্তৃপক্ষের প্রতি অনাস্থা প্রকাশের একটি আলোচিত প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তবে স্লোগানটির পেছনের বার্তাগুলোর প্রকৃত উৎস নিশ্চিত না হওয়ায় বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

সর্বশেষ