ফ্যাসিবাদ কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি একটি মানসিকতা, যা সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, জনগণের অধিকার ও প্রত্যাশাকে উপেক্ষা করে কেউ ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবে না। জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হলে অতীতের মতো রাজনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭ নভেম্বরের ইতিহাস থেকে রাজনৈতিক নেতাদের অনেক কিছু শেখার ছিল। কিন্তু দীর্ঘ ৫৫ বছর ধরে এ দিবসের তাৎপর্য আলোচিত হলেও রাজনীতিতে তার যথাযথ প্রতিফলন দেখা যায়নি। জনগণের মতামত, অধিকার ও আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব না দিলে দেশে বারবার বিপ্লব ও গণ-অভ্যুত্থানের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে রাজনৈতিক সংকট, একদলীয় শাসন, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক বৈষম্য তৈরি হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি সেনাবাহিনীর মধ্যেও অসন্তোষ বাড়তে থাকে। তার মতে, সেনাবাহিনীকে অবমূল্যায়ন করে রক্ষীবাহিনীকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়াও তৎকালীন সংকটের অন্যতম কারণ ছিল।
রক্ষীবাহিনীর কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তিনি অভিযোগ করেন, সে সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও মানুষের অধিকার হরণের ঘটনা ঘটেছিল। তার দাবি, হাজার হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়। মুক্তিযোদ্ধারাও এ ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে জনগণের রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ঘটে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও সীমিত করা হয়েছিল। চারটি সংবাদপত্র ছাড়া অন্য সব সংবাদমাধ্যম বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
তৎকালীন অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, দেশের সম্পদ লুটপাট, ত্রাণসামগ্রী বিতরণে অনিয়ম এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। ক্ষমতাসীনদের মধ্যে জবাবদিহির অভাব তৈরি হলে রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে।
৭ নভেম্বরের ঘটনা ও জনগণের সমর্থন
৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ থেকেই সেদিনের ঘটনা ঘটেছিল। শুরুতে এটি মূলত সিপাহিদের উদ্যোগে সংঘটিত হলেও পরবর্তী সময়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন এতে যুক্ত হয়।
নিজের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ওই সময় তিনি সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। ৭ নভেম্বরের পরদিন কারফিউ জারি থাকলেও জুমার নামাজের জন্য কয়েক ঘণ্টা তা শিথিল করা হয়েছিল। তখন মসজিদ, বাড়ির ছাদ ও রাস্তায় বিভিন্ন বয়সী মানুষের উপস্থিতি এবং তাদের উচ্ছ্বাস তিনি নিজ চোখে দেখেছিলেন।
তিনি বলেন, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বন্দি ছিলেন। পরবর্তী সময়ে সিপাহিরা তাকে মুক্ত করেন। ভোরে ট্যাংক ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে সেনাসদস্যরা রাস্তায় নামলে সাধারণ মানুষ তাকবির ধ্বনি দিয়ে তাদের স্বাগত জানান। এভাবেই সিপাহিদের উদ্যোগের সঙ্গে জনগণের সমর্থন যুক্ত হয়ে ঘটনাটি বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিতি পায়।
ইতিহাসে সবার অবদান স্বীকারের আহ্বান
স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বক্তব্যে জামায়াত আমির বলেন, দেশের ইতিহাস কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। মুক্তিযুদ্ধে যার যে অবদান রয়েছে, তাকে যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। জিয়াউর রহমানের ভূমিকার পাশাপাশি স্বাধীনতার ঘোষণা, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের সামরিক নেতৃত্বে জেনারেল এম এ জি ওসমানীর অবদানও যথাযথভাবে আলোচনায় আসা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্যের অবদান স্বীকার করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। নিজের দল বা নেতার বাইরে অন্য কারও ভূমিকা স্বীকার না করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমানের মতে, ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের রাজনৈতিক ঘটনাগুলোর পেছনে কর্তৃত্ববাদী শাসন, একদলীয় ব্যবস্থা এবং জনগণের অধিকার সংকুচিত হওয়ার বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। মানুষ স্বাধীন দেশে মতপ্রকাশ, ন্যায়বিচার, কর্মসংস্থান ও নাগরিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে চেয়েছিল।
১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে বক্তব্য
১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থান ও এরশাদ সরকারের পতনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে কোনো শাসকই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারেন না। বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর জনগণ তার কাছ থেকে গণতন্ত্র রক্ষার প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তার ভাষ্য, রাষ্ট্রপতি হিসেবে জনগণের কাছ থেকে পাওয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে রক্ষা করা প্রয়োজন ছিল। পরে এরশাদ ক্ষমতা গ্রহণ করে দীর্ঘ নয় বছর দেশ পরিচালনা করেন। কিন্তু মানুষের বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সংকুচিত করার কারণে শেষ পর্যন্ত গণ-আন্দোলনের মুখে তাকেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড নিয়েও বক্তব্য দেন জামায়াত আমির। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের বিভিন্ন দিক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্ক রয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার দাবি
বিএনপি সরকারের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর অতীত রাজনৈতিক সম্পর্কের প্রসঙ্গ তুলে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বেগম খালেদা জিয়া সরকার গঠনের সময় বিএনপির প্রয়োজনীয় আসনসংখ্যা ছিল না। সে সময় দেশের স্বার্থে জামায়াতে ইসলামী ১৮টি আসন নিয়ে সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল।
তিনি দাবি করেন, জামায়াত তখন স্পষ্ট করেছিল যে তারা সরকারে যোগ দেবে না কিংবা কোনো রাজনৈতিক জোটে অংশ নেবে না; বরং বিরোধী দল হিসেবেই থাকবে। তাদের সমর্থনের অন্যতম শর্ত ছিল, যে নির্বাচনী ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হয়েছিল, সেটিকে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা।
জামায়াত আমির বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার কাছে দলের একটি প্রতিনিধিদল এ দাবি নিয়ে গিয়েছিল। তবে বিএনপি সরকার তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৪ সাল থেকে এ দাবিতে আন্দোলন শুরু করে জামায়াতে ইসলামী।
তিনি বলেন, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবি মেনে নেওয়া হলে রাজনৈতিক সংঘাত ও আন্দোলনের প্রয়োজন হতো না। সরকারকে শেষ পর্যন্ত সমঝোতার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানো হয়নি।
রাজনীতিতে সমঝোতা ও নমনীয়তার প্রয়োজন
রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে পারস্পরিক আলোচনা, সমঝোতা ও নমনীয়তা অপরিহার্য। রাজনৈতিক দলগুলো যদি আলোচনার পথ বন্ধ করে দেয় এবং একক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চায়, তাহলে রাজনীতি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ারে পরিণত হয়।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত না করে কোনো নির্বাচন আয়োজন করলে তা গণতন্ত্রের প্রকৃত চেতনা পূরণ করতে পারে না। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনগণের মতামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে জামায়াত আমির বলেন, ফ্যাসিবাদী মানসিকতা থেকে রাষ্ট্র ও সমাজকে মুক্ত করতে হলে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। যারা মানুষের প্রত্যাশা বুঝবেন না এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করবেন না, তাদের জন্য ইতিহাসে বারবার সতর্কবার্তা রয়েছে।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। এতে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

