নিজস্ব প্রতিবেদক: পোশাকশ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে চলা আন্দোলনকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে প্রশাসন। আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা, কারখানায় ভাঙচুর, গাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলার ঘটনায় সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন শিল্পপতির ইন্ধন থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় কারা অর্থ ও লোকবল সরবরাহ করেছে, তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
সম্প্রতি গাজীপুর জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত আওয়ামী লীগপন্থি মালিকদের কারখানার একটি তালিকা সামনে আসার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তিন পৃষ্ঠার ওই তালিকায় সেপাল, রেনেসাঁ, তুসুকা, মসল, হামিম, ইসলাম, স্টারলিং ও বেক্সিমকোসহ কয়েকটি শিল্পগ্রুপের নাম রয়েছে। তালিকায় সংশ্লিষ্ট কারখানা, মালিক এবং তাঁদের রাজনৈতিক পরিচয়ও উল্লেখ করা হয়েছে।
পোশাকশ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে গত কয়েক দিন গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও রাজধানীর মিরপুরে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করেন। কোথাও কোথাও ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, পাল্টাপাল্টি ধাওয়া এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এতে শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং স্বাভাবিক উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গত ১ নভেম্বর সরকার ছয় সদস্যের মজুরি বোর্ড গঠন করে। একই দিন শ্রমিক, মালিক ও সরকারের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় জরুরি ত্রিপক্ষীয় বৈঠক। বৈঠকে জানানো হয়, জানুয়ারি থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে। তবে মজুরি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার নেপথ্যেও নজর দিচ্ছে প্রশাসন।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তালিকায় সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেপাল গ্রুপের চারটি প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে। সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রেনেসাঁ গ্রুপের একাধিক কারখানার নামও তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য হুমায়ুন রশীদ বাদলের তুসুকা গ্রুপ এবং সাবেক সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের মসল গ্রুপের নাম রয়েছে।
তালিকায় আরও রয়েছে হামিম গ্রুপের মালিক এ কে আজাদ, ইসলাম গ্রুপের মালিক আতিকুল ইসলাম, স্টারলিং গ্রুপের মো. সিদ্দিকুর রহমান এবং বেক্সিমকো গ্রুপের সালমান এফ রহমানের নাম। তবে তালিকায় নাম থাকা এবং আন্দোলনের সহিংসতায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফলাফল এখনো জানা যায়নি।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, শ্রমিক অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। নাশকতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো তথ্য সংগ্রহ করছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, সাধারণ শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁর মনে হয়েছে, তাঁদের অনেকেই আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত নন। এমনকি অনেকে কী কারণে আন্দোলন হচ্ছে, তা-ও জানেন না।
এদিকে আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় উসকানিদাতা ও ইন্ধনদাতাদের শনাক্তে কাজ করছে গাজীপুর মহানগর পুলিশ। বিক্ষোভের সময় ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও এবং সাংবাদিকদের কাছ থেকে পাওয়া ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার ইসরাইল হাওলাদার বলেন, এসব ঘটনার বিষয়ে পুলিশের কাছে বেশ কিছু তথ্য রয়েছে। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে উসকানিদাতা ও ইন্ধনদাতাদের উপস্থিতি দেখা গেছে। যারা আন্দোলনে উসকানি দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তাঁদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও কর্মপরিবেশের দাবির বিষয়টি একদিকে যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন, অন্যদিকে আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে কেউ সহিংসতা বা নাশকতা চালিয়েছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা জরুরি। শিল্পাঞ্চলে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে প্রকৃত শ্রমিকদের দাবি ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের ভূমিকা আলাদাভাবে চিহ্নিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

