ডেমোক্র্যাটদের জয়ে চাপে ট্রাম্প, ইরান যুদ্ধ বন্ধে বাড়ছে তাগিদ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
spot_img

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় বিজয়ের পর ইরান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের সমর্থন নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। নির্বাচনী ফলাফলের প্রভাবে ইরান যুদ্ধ বন্ধে চাপ বাড়ার পাশাপাশি ইসরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা ও দেশটির প্রতি মার্কিন নীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নতুন করে টানাপোড়েনের মুখে পড়তে পারে।

- Advertisement -

বিশ্লেষকদের ধারণা, কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের শক্তিশালী অবস্থান ইরান যুদ্ধের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ইসরায়েলকে দেওয়া সামরিক সহায়তা পুনর্বিবেচনার পথ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ক্ষমতা ব্যবহার করে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা।

নির্বাচনের আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধ হয়ে যাবে। নির্বাচনে পরাজয়ের পর তিনি স্বীকার করেন, ইরান যুদ্ধ এবং যুদ্ধের প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও ইরান যুদ্ধ ও ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে নির্বাচনী ফলাফলের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

ডেমোক্র্যাটদের কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটানো। এরপর গাজা ও পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। সম্ভাব্য সিনেট সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা চাক শুমার জানিয়েছেন, কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে যুদ্ধ বন্ধে প্রশাসনের ওপর চাপ দেওয়া হবে।

এ ক্ষেত্রে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বন্ধে অতীতে কংগ্রেসের নেওয়া কৌশল অনুসরণ করতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা। সরকারি কার্যক্রম চালু রাখার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন বিলে ইরানের উপকূলসংলগ্ন মার্কিন সামরিক অভিযানের অর্থ বরাদ্দ বন্ধের শর্ত যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ট্রাম্প প্রশাসনকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। কারণ, প্রেসিডেন্ট বিলে স্বাক্ষর না করলে সরকারের কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের জন্য মার্কিন সামরিক সহায়তাও রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হতে পারে। দুই দেশের মধ্যে ১০ বছর মেয়াদি চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত প্রতিবছর ইসরায়েলকে ৩৮০ কোটি ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। তবে এই অর্থ ছাড়ের জন্য প্রতিবছর কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে ডেমোক্র্যাটরা চাইলে আগামী বছর থেকেই সহায়তা কমানো কিংবা বন্ধের উদ্যোগ নিতে পারবেন।

এদিকে গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরিতে ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত ‘বোর্ড অব পিস’-এর ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। বোর্ডটির পরিকল্পনায় যুক্ত থাকা জ্যারেড কুশনারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতারা। এ নিয়ে কংগ্রেসে বিরোধ তৈরি হলে গাজার পুনর্গঠন পরিকল্পনাও বাধার মুখে পড়তে পারে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, ইসরায়েলের সমালোচনা করা প্রত্যেক ব্যক্তি দেশটির বিরোধী নন; অনেকেই মূলত পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং নেতানিয়াহু সরকারের নীতির বিরোধিতা করছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্মের ডেমোক্র্যাট নেতাদের মধ্যে এ ধরনের আলোচনাকে যথেষ্ট মনে করছেন না অনেকে। নবনির্বাচিত কংগ্রেস সদস্য ব্র্যাড ল্যান্ডার বলেছেন, মার্কিন ভোটাররা শুধু রাজনৈতিক আলোচনা নয়, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের প্রতি ইসরায়েলের সম্মান দেখতে চান। মিশিগানের ডেমোক্র্যাট নেতা জর্ডান অ্যাকারও মনে করেন, ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরায়েলের আচরণ নিয়ে মার্কিন জনগণের ক্ষোভ দেশটির নেতারা যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারছেন না।

সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরোর মতে, নেতানিয়াহুকে ক্ষমতায় রেখে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম। বরং ইসরায়েলের নেতৃত্বে নতুন মুখ আসা সম্পর্ক পুনর্গঠনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তিনি মনে করেন, নেতানিয়াহু এখন শুধু ডেমোক্র্যাটদের নয়, রিপাবলিকান দলের অনেকের কাছেও আগের মতো গ্রহণযোগ্য নন।

বিশ্লেষক জোয়েল ব্রাউনল্ডের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলেই ইসরায়েলের বর্তমান নীতি নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

অন্যদিকে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অবস্থান অনুযায়ী, ইরান, লেবানন, সিরিয়া, গাজা কিংবা পশ্চিম তীর—মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ক্ষেত্রেই ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড যেন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থ ও নীতির পথে বাধা না হয়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, যেখানে শুধু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তনের দাবি নয়, দেশটির সামগ্রিক পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিতেও পরিবর্তনের চাপ বাড়বে।

সব মিলিয়ে ডেমোক্র্যাটদের নির্বাচনী সাফল্য যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের প্রচলিত সমীকরণে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। ইরান যুদ্ধের ভবিষ্যৎ, সামরিক সহায়তা এবং ফিলিস্তিন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের অবস্থান আগামী দিনে দুই দেশের সম্পর্কের গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল

সর্বশেষ